জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NMHS) 2015–16 অনুযায়ী, ভারতে প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে একজনের কোনো না কোনো ধরণের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে এই সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এখনও খুবই সীমিত। বিভিন্ন মানসিক রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা না পাওয়ার হার 70 থেকে 92 শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেগুলোর বেশিরভাগই ‘একই ছাঁচের’। যেমন — পশ্চিমের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি কিছু নির্দিষ্ট রোগনির্ণয় পদ্ধতি ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দেশের ক্ষেত্রে বাস্তুবে সব সময় কার্যকর বা প্রাসঙ্গিক নাও হতে পারে।
উত্তরাখণ্ডের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা বুরান্স-এ আমরা এই ঘাটতি দূর করার চেষ্টা করি কমিউনিটি-ভিত্তিক একটি পদ্ধতির মাধ্যমে। এখানে মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক সমস্যাগুলিকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এই পদ্ধতিতে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে সেই বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই কর্মসূচি, উপকরণ ও কাজের পদ্ধতি তৈরি করা যায়। আমরা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের (EBEs) সঙ্গেও কাজ করি — অর্থাৎ যাঁরা নিজেরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন, অথবা এমন কাউকে দেখাশোনা করেছেন যিনি এই সমস্যায় ভুগেছেন। এতদিন ধরে এই মানুষগুলি মূলত স্বাস্থ্য পরিষেবা ও গবেষণার সুবিধাভোগী ছিলেন, কিন্তু আমরা চাই, তাঁরা যেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াতেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
বুরান্স অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকল্পনা তৈরি, বাস্তবায়ন, পরিষেবা প্রদান এবং তার মূল্যায়ন করে। এই যৌথ উদ্যোগের ফলে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা মানুষের চাহিদাকেই কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, নতুন ও কার্যকর পদ্ধতির সুযোগ তৈরি হয়, এবং পরিষেবাগুলি আরও ন্যায্য ও সবার জন্য সহজলভ্য হয়।
2014 সাল থেকে আমরা উত্তরাখণ্ডের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় কাজ করছি, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ খুবই সীমিত— এমনকি অনেক জায়গায় তো একেবারেই নেই। যাঁরা নিজেরা আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং সম্মতি দেন, তাঁদের জন্য আমরা বাড়িতে গিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের ব্যবস্থা করি। পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিক সরকারি প্রকল্পগুলি পেতেও সহায়তা করি। আমাদের কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞরা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনেন, ব্যক্তিগত পরিচর্যা পরিকল্পনা করেন এবং সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে মানুষের পাশে থাকেন। এর মাধ্যমে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে বসবাসকারী সম্প্রদায়গুলির মানসিক কষ্টের মূল সামাজিক কারণগুলি সমাধান করার চেষ্টা করি। এছাড়াও, স্থানীয় মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আমরা আর্থিক সচেতনতা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করি।
আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি যে, যাঁরা বুনিয়াদি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে চান, এমন অনেক সংস্থাই ঝুঁকি কমানোর জন্য বা পর্যাপ্ত অর্থ ও সম্পদের অভাবে পশ্চিমের বা ভারতের বাইরের দেশগুলির পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে কর্মসূচি চালু করেন। কিন্তু এতে সব সময় স্থানীয় মানুষের বাস্তব প্রয়োজন সঠিকভাবে ধরা পড়ে না। তবে ‘অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ’ পদ্ধতির ব্যবহার করলে, এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়। আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে মানসিক অসুস্থতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে—এই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ালে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি তাঁদের কাজের ভিতরেও কমিউনিটিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে। যেমন, কর্মী নিয়োগ বা কর্মসূচি পরিকল্পনা। একই সঙ্গে, যাঁদের জন্য এই কাজ করা হচ্ছে, তাঁদের কাছ থেকে নিয়মিত মতামত ও প্রতিক্রিয়া নিলে কাজের স্বচ্ছতা বাড়ে ও সম্পর্কও ধীরে ধীরে আরও দৃঢ় হয়।

মানসিক স্বাস্থ্যে কমিউনিটি-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি
আমরা যেসব কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করি, সেগুলিকে আমরা দুইভাবে দেখি: প্রথমত, সীমিত সুযোগ–সুবিধাসম্পন্ন বড় কোনো এলাকা বা পাড়া হিসেবে, এবং দ্বিতীয়ত, সেই এলাকার এমন মানুষদের একটি সমষ্টি হিসেবে, যাঁরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এরপর আমরা এই সমষ্টিগুলির মধ্য থেকেই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের চিহ্নিত করি এবং ধীরে ধীরে তাঁদের গড়ে তুলি।
ঐতিহাসিকভাবে, মানসিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধীদের বিচারবুদ্ধিহীন হিসেবে দেখা হয়ে আসছে এবং তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে প্রায়শই অবমূল্যায়ন করা হয়। সমাজের প্রান্তিক মানুষদের প্রায়ই ভাবনা গড়ে তোলার কাজ বা কোনো উদ্যোগের পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়া হয় কারণ তাঁদের নিজেদের স্বাস্থ্য চাহিদা পূরণের জন্য ‘অযোগ্য’ বলে মনে করা হয়।। অন্যদিকে, বাইরের পরিষেবা প্রদানকারী, যাঁদের সাধারণত উচ্চশিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে, তাঁদের দক্ষতাকেই কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি তৈরির জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত সেই মানুষগুলোর মধ্যেই অযোগ্যতা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তোলে, যাঁদের সহায়তা করার জন্য এই পরিষেবাগুলো তৈরি করা হয়েছে।
EBE গোষ্ঠীগুলি তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
ধরা যাক, শহুরে পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন পুরুষ সমাজকর্মী আছেন, যাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে কিন্তু নিজের জীবনে মানসিক অসুস্থতার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তিনি যদি গ্রামীণ এলাকার নারীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উদ্যোগ বা কর্মসূচি তৈরি করছেন, তাহলে এই কর্মসূচিগুলিকে কার্যকর করতে হলে তাঁকে কিছু বিষয় আগে ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নিজের সামাজিক সুবিধা বা বিশেষাধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া, লিঙ্গ, শ্রেণি ও সামাজিক অবস্থান কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িত—তা বোঝা, এবং দারিদ্র্য বা সামাজিক বৈষম্যের মতো চাপ কীভাবে মানসিক সমস্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে, সে সম্পর্কে জানতে হবে।
EBE দলগুলি নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞান থেকে মানসিক স্বাস্থ্য, সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরে যা কর্মসূচির পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়ক। এই পদ্ধতিতে শুধু উদ্যোগগুলির কার্যকারিতাই বাড়ে না, বরং শুধু তথাকথিত ‘বস্তুনিষ্ঠ’ বহিরাগত পেশাদারদের উপর নির্ভর না করে মানুষের নিজস্ব দক্ষতা, সক্ষমতা ও জ্ঞানকেও যথাযথ মূল্য দেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে মানুষের আত্মবিশ্বাস ও মালিকানাবোধ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত একটি টেকসই ও কমিউনিটি-চালিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে সহায়ক হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে কুসংস্কার, গোপনীয়তা এবং অকার্যকর বা এমনকি ক্ষতিকর অভ্যাসগুলি এখনও বিদ্যমান। যেহেতু এই চ্যালেঞ্জগুলি এখনো গভীরভাবে প্রোথিত, তাই এগুলির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ও স্থানীয় সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে।
মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মানানসই উদ্যোগ নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি কীভাবে EBE পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে, তা নিচে তুলে ধরা হলো।
1. বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি EBE দল গঠন করুন
ন্যায়ভিত্তিক কাজের পদ্ধতি ও ফলাফল নিশ্চিত করতে হলে, যেকোনো নতুন কর্মসূচির শুরু থেকেই কাঠামোগত বৈষম্য এবং প্রান্তিকতার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। অনেক সময় দেখা যায়, সংস্থাগুলি এমন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পরামর্শদাতাদের যুক্ত করে, যাঁরা শিক্ষা বা আর্থ-সামাজিক অবস্থানের কারণে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পান। যদিও তাঁদের অভিজ্ঞতা মূল্যবান, কিন্তু এর পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষ, যাঁদের একাধিক স্তরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যেসব কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করি, সেগুলির বেশিরভাগ মানুষই নানা ধরণের আর্থ-সামাজিক ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার সম্মুখীন। তাঁদের অনেকেই পরিযায়ী এবং প্রায়ই তাঁরা অস্থায়ী ও অননুমোদিত বসতিতে বসবাস করেন, যেখানে সাধারণ সুযোগ–সুবিধাগুলি সবার জন্য হলেও সেগুলি নিম্নমানের এবং সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণও ঠিকমতো করা হয় না।
বুরান্স কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা এমন কমিউনিটির সদস্যদের অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান যাঁদের জীবনে নিচের অন্তত দুইটি পরিচয় বা অভিজ্ঞতা একসঙ্গে বিদ্যমান: (1) অননুমোদিত বস্তি বা প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাসকারী, (2) মানসিক ও সামাজিক অক্ষমতার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, (3) সীমিত প্রথাগত শিক্ষা, (4) নিজেকে মহিলা হিসেবে পরিচয় দেন, (5) দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস এবং (6) পরিবারপ্রধান একজন মহিলা—যেমন, বিধবা মহিলা।
কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময় আমাদের দলগুলিতে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমির মানুষের পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন মানসিক অসুস্থতা ও প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, একে অপরের অভিজ্ঞতা আরও ভালোভাবে বোঝা এবং সংবেদনশীল ও সৃজনশীল সমাধান তৈরি করার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তোলা।
2. কথা বলার জন্য একসঙ্গে মিলে একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা
আমরা যৌথভাবে কর্মসূচি তৈরির জন্য যেসব দল গঠন করেছি, সেগুলির অনেক আলোচনাতেই দেখা গেছে—কয়েকজন সরব অংশগ্রহণকারীই আলোচনা নিয়ন্ত্রণ করেন। অন্যদিকে, গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষ এবং/অথবা যাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম, তাঁরা বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকেন। তাঁদের অনেকে আমাদের জানিয়েছেন, নিজের মতামত জানানোর সুযোগ তাঁরা ঘরেও খুব একটা পান না তাই দলের আলোচনাতেও তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারেন না।
ফেসিলিটেটরদের ভূমিকা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের খেয়াল রাখতে হবে যাতে দলের সবাই নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ পান। অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি সহজ উপায় হলো—দলের সদস্যদের একে একে কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং শুরুতে খুব সাধারণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলা। উদাহরণস্বরূপ, এমন কিছু শেয়ার করে নেওয়া যার জন্য তাঁরা কৃতজ্ঞ। এতে মানুষ ধীরে ধীরে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। এরপর অংশগ্রহণকারীরা পালাক্রমে কর্মসূচির পরিকল্পনার আরও সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে মতামত জানাতে পারেন। দলের সদস্যদের এমন কোনো ক্ষেত্রে অবদান রাখতেও বলা যেতে পারে যেখানে তাঁদের সুস্পষ্ট দক্ষতা রয়েছে।। এছাড়া দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীরা যখন একে অন্যের সঙ্গে আর্থ-সামাজিক পটভূমিতে মিল খুঁজে পান, তখন তাঁরা আলোচনায় আরও বেশি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
3. বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা
যৌথভাবে কর্মসূচি তৈরি করার পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাস। বাস্তবে এর অর্থ হলো—দলের প্রকৃত কাজ শুরু করার আগে চার থেকে আট সপ্তাহ ধরে EBE-দের সঙ্গে একাধিকবার দেখা করা। এই প্রাথমিক বৈঠকগুলিতে মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলি ভাগ করে নেওয়া, খেলাধুলা ও অভিনয়ভিত্তিক কার্যক্রম (রোল-প্লে) অন্তর্ভুক্ত থাকে। দলের ফেসিলিটেটররা যখন নিজেদের জীবনের বৈষম্য বা মানসিক কষ্টের অভিজ্ঞতার কথা সকলের সঙ্গে শেয়ার করে নেন, তখন দলের অন্য সদস্যদেরও তাঁদের উপর ভরসা করা, সংযোগ তৈরি করা এবং নিজের কথা খুলে বলা অনেক সহজ হয়ে যায়।
কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মীরা, যাঁরা EBE, তাঁরা যখন সহ-ফেসিলিটেটর হিসেবে কাজ করেন, তখন দলের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি আরও বেড়ে যায় কারণ তাঁরা এলাকার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বোঝেন। আমরা আমাদের কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিকল্পনা নিয়ে প্রশিক্ষণ দিই এবং তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে ও বাইরে ভাগ করে নিতে উৎসাহ প্রদান করি, যাতে তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মিত কার্যক্রমের মাধ্যমে দলগতভাবে মানুষের মধ্যে একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা, মন দিয়ে কথা শোনা, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতা এবং মানুষকে আগে থেকে বিচার না করে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে ওঠে।
4. EBE-দের নিজেদের দক্ষতার প্রতি আত্মবিশ্বাসী করে তোলা
যাঁরা নানা ধরনের সামাজিক ও কাঠামোগত বৈষম্যের অভিজ্ঞতার শিকার, তাঁদের জন্য নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে ‘দক্ষতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সহজ হয় না। বিশেষ করে, তাঁরা যদি আগে কখনো প্রকাশ্যে নিজের মতামত জানানোর সুযোগ না পেয়ে থাকেন।
তাই অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন ধরণের সুযোগ তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে দলের সদস্যদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বস্তিকর পরিবেশ গড়ে ওঠে, যেখানে সবাই নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারেন।
তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে নিজের কাছে এবং দলের অন্য সদস্যদের কাছেও দৃশ্যমান করে তুলতে হবে, যাতে তাঁরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের মতামত তুলে ধরতে পারেন। এর একটি কার্যকর উপায় হলো এমন একটি সুনির্দিষ্ট কাজ নির্ধারণ করা, যার জন্য নিবিড় প্রাসঙ্গিক জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তাঁদের সামনে একটি ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে—এই ছবিটি কীভাবে তাঁদের কমিউনিটির মানুষের জন্য আরও অর্থবহ বা প্রাসঙ্গিক করা যায়। আরেকটি উদাহরণ হলো এমন একজন মানুষ, যিনি প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে এটি হয়তো জীবনের একটি স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা মাত্র। কিন্তু যখন তাঁকে সেই পুরো প্রক্রিয়া ও নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে বলা হয়, তখন তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন—এই অভিজ্ঞতাই আসলে তাঁর বিশেষ দক্ষতা।
অংশগ্রহণের জন্য নানা ধরণের সুযোগ তৈরি করলে দলের সদস্যদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে ওঠে। নইলে অনেকেই অন্যদের সামনে কথা বলার সময় সমালোচিত বোধ করতে পারেন। এই বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা মানুষের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গুরুত্ব দেওয়ার জন্য কিছু সৃজনশীল পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। যেমন, একটি দল পুরো জেলাজুড়ে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে একটি স্থানীয় কর্মসূচির আয়োজন করতে পারে। ফলে দলের সদস্যরা সেখানে নিজের নিজের কমিউনিটির মানুষের সামনে কথা বলার সুযোগ পাবেন। দক্ষতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আরেকটি উপায় হলো আর্থিক সম্মানী প্রদান করা। এতে করে দলের সদস্যদের—বিশেষ করে মহিলাদের—মিটিং বা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অনুমতি পাওয়া সহজ হয়। পাশাপাশি এটি স্পষ্টভাবে বোঝায় যে প্রকল্পে তাঁদের সময়, শ্রম ও অবদানকে আমরা মূল্য দিচ্ছি।
5. লোক দেখানো প্রতিনিধিত্ব থেকে যেকোনো মূল্যে বিরত থাকতে হবে
সহ-উৎপাদন বা কো–প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে অনেক সময় অজান্তেই ‘লোক দেখানো’ অংশগ্রহণের ঝুঁকি তৈরি হয়। যেমন, আইনের বাধ্যবাধকতায় কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ যদি একজন রোগীকে জিজ্ঞেস করেন—“আপনার কাছে কী গুরুত্বপূর্ণ?”, তাহলে তিনি হয়ত সেটি শুধু একজন চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য করবেন। এমন ক্ষেত্রে বিশেষ করে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ বা যাঁদের গুরুতর মানসিক সমস্যা রয়েছে, তাঁরা অনেক সময় এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে চাপ অনুভব করেন। কেউ কেউ আবার ভাবতে পারেন—চিকিৎসককে খুশি করার মতো উত্তর দিতে হবে। আবার কারও ক্ষেত্রে হঠাৎ এমন প্রশ্ন করা মানসিক অস্বস্তি, বিভ্রান্তি বা উদ্বেগও তৈরি করতে পারে।
স্বল্প সাক্ষরতার হার এবং চিকিৎসক–রোগীর সম্পর্কের মধ্যে থাকা শ্রেণিবিন্যাস অর্থবহ অংশগ্রহণকে আরও জটিল করে তোলে। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সময় প্রকৃত পরিষেবার মান উন্নত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা না হয়ে কেবল লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। তাই চিকিৎসক ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মীদের দায়িত্ব হলো আন্তরিকভাবে পরিস্থিতিটি বোঝা এবং নিজেদের ও তাঁদের রোগীদের মধ্যে অপরিহার্যভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা।

ধৈর্য, নমনীয়তা এবং সাংগঠনিক বিনয়ের প্রতি অঙ্গীকার
গণতান্ত্রিক নীতিগুলো বাস্তবে চালু করা কোনো সহজ বা তাড়াহুড়োর কাজ নয়। এটি ধীরে ধীরে, সচেতনভাবে এগোনোর একটি প্রক্রিয়া। এই কাজ শুধু কর্মসূচির পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এর জন্য প্রতিষ্ঠানের ভাবনা, সংস্কৃতি এবং কাজ করার ধরণেও পরিবর্তন আনতে হয়।
1. অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলিকে সবার জন্য সহজ ও ন্যায়সঙ্গত করা
গণতান্ত্রিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে ও বাস্তবায়ন করতে প্রথমেই আমাদের নিজেদের কাজ করার ধরণে পরিবর্তন আনতে হয়েছে, যাতে তা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা গ্যান্ট চার্ট-এর মতো জটিল সাংগঠনিক টুল ব্যবহার করা ছেড়ে এমন পদ্ধতি গ্রহণ করেছি, যা আমাদের EBE উপদেষ্টাদের জন্য বেশি সহজ ও বোধগম্য। এছাড়াও আমরা সচেতনভাবে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি, যাতে অফিসের দৈনন্দিন কাজ—যেমন ঘর ঝাড়ু দেওয়া বা চা বানানোর মতো কাজগুলি—সবাই মিলেমিশে ভাগ করে করতে পারে। এর জন্য একটি রোস্টার বা পালাক্রমের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
একে অপরকে কী বলে সম্বোধন করবে আমরা সেই ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করেছি। যেমন ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’-এর মতো শব্দগুলো ব্যবহার না করে আমরা ‘দিদি’ বা ‘ভাই’-এর মতো সমতার বার্তা দেয় এমন সম্বোধন ব্যবহার শুরু করেছি, কারণ আগের সম্বোধনগুলি ক্ষমতার পার্থক্যকে স্পষ্ট করে তোলে। আমাদের আশা, যখন নিজেদের দলের ভিতর ভেদাভেদের এই অভ্যাস কমে যাবে, তখন সেটির প্রভাব কমিউনিটির সঙ্গে আমাদের কাজেও পড়বে। তবে সমাজে গেঁথে থাকা সামাজিক ও ক্ষমতার কাঠামো সহজে বা দ্রুত বদলে যায় না—এর জন্য নিয়মিত ও সচেতন প্রচেষ্টা দরকার। বৈষম্যের নানা কাঠামোর কারণে EBE সদস্যরা—বিশেষ করে প্রান্তিক ও সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মানুষ—অনেক সময় নিজের মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করেন। তাই সবাই যেন পূর্ণভাবে অংশ নিতে পারেন, সেই দায়িত্ব আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরই।
2. EBE-দের প্রয়োজনের প্রতি সংবেদনশীল থাকা
প্রভাবিত হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলির উচিত EBE-দের কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। সভা ও কার্যক্রমের সময় এবং স্থান এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে তা কমিউনিটির সদস্যদের জন্য সুবিধাজনক হয়। আমরা আরও দেখেছি যে EBE দলগুলোতে সদস্য পরিবর্তনের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের বুঝতে হয়েছে এবং মেনে নিতে হয়েছে যে কেউ স্বল্প সময়ের জন্য বা কেউ দীর্ঘ সময়ের জন্যেও এই ভূমিকা থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
3. তহবিলদাতাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা
আমরা তহবিল প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে কো-প্রোডাকশন প্রক্রিয়া এবং EBE-দের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য ধীরে ধীরে কাজ করা এবং তুলনামূলকভাবে বেশি সময়ের প্রয়োজন। এতে সবাই ভালোভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। যদিও বেশিরভাগ তহবিল প্রদানকারী সংস্থা এই বিষয়টি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন, তবুও কিছু সংস্থা সময়সীমার বিষয়ে এখনো নিজেদের অবস্থান বদলাতে চাইছেন না।
মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবায় কো-প্রোডাকশন শুধু সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি ক্ষমতার সম্পর্ক বদলের একটি প্রক্রিয়া। যাঁরা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন, তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং কর্মসূচির পরিকল্পনায় একেবারে শুরু থেকেই তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলে, প্রতিষ্ঠানগুলি এমন মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা গড়ে তুলতে পারে যা আরও প্রাসঙ্গিক, সহজলভ্য এবং ন্যায়সংগত।
এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI।
—
আরও জানুন
- জানুন কীভাবে জাতিভেদ প্রথা ও পিতৃতন্ত্র মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে প্রভাবিত করে।
- ভারতে জৈব–মনস্তাত্ত্বিক–সামাজিক (বায়োপসাইকোসোশ্যাল) প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বসবাস করা মানুষদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় কী কী ঘাটতি আছে সেই সম্পর্কে বুঝুন।
- মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ এলাকায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদানকারী কমিউনিটি-ভিত্তিক কর্মসূচি আত্মীয়তা সম্পর্কে পড়ুন।






