গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইন (PWDVA), 2005, হলো একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, যা ভারতের মহিলাদের ওপর হওয়া পারিবারিক অত্যাচার বন্ধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আগের আইনগুলি যথেষ্ট ছিল না বলেই এই নতুন আইনটি আনা হয়, যাতে মহিলাদের সুরক্ষা, প্রতিরোধ এবং সঠিক বিচার পাওয়ার একটি মজবুত ব্যবস্থা থাকে। যদিও এই আইনটি ভুক্তভোগীদের কথা ভেবেই তৈরি, তবুও বাস্তবে এর অনেক প্রতিকূলতা রয়েছে। এর ফলে বিচার পেতে দেরি হয়, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং শাসনব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের ভরসা কমে যায়। এই আইনকে সফল করতে হলে শুধু কাগজের নিয়মের দিকে তাকালে চলবে না, বরং যারা এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের বাস্তব সমস্যার দিকেও নজর দিতে হবে।
SNEHA মুম্বাই ভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা, যারা 1999 সাল থেকে বিশেষ করে শহরের বস্তি এলাকাগুলিতে মহিলা ও শিশুদের ওপর হওয়া অত্যাচার রুখতে কাজ করছে। মহিলাদের সংকটকালীন সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি আমরা তাঁদের কাউন্সেলিং-এর সুবিধাও প্রদান করি। দীর্ঘ বছরের কাজের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি যে এই আইনটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে ঠিক কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এই নিবন্ধটি কেবল তাত্ত্বিক পর্যালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সুরক্ষা কর্মকর্তা, বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থা, আইন বিশেষজ্ঞ এবং বিশেষ করে ভুক্তভোগী মহিলাদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। আমাদের কাউন্সেলিং সেন্টারে আসা মহিলারা প্রায়শই জানান যে বিচার পেতে দেরি হওয়া, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিচ্ছিন্ন সহায়তা ব্যবস্থার কারণে তাঁদের প্রয়োজনের মুহূর্তে যথাযথ সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই নিবন্ধে আমরা PWDVA বাস্তবায়নের প্রধান বাধাগুলি তুলে ধরেছি এবং মর্যাদা, দ্রুততা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কিছু বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছি।
1. অভিযোগ জানানোর জন্য সহজ ‘ই-ফাইলিং’ (অনলাইন) ব্যবস্থা তৈরি করা
মামলার প্রক্রিয়া দ্রুত এবং সহজ করতে PWDVA আইনে অনলাইনে অভিযোগ বা ই-ফাইলিং-এর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ভালো পদক্ষেপ মনে হলেও, এর আসল দিকটা বেশ জটিল।
সংকটময় মুহূর্তে, ভুক্তভোগীরা প্রায়শই জরুরি ও প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তখন এই ই-ফাইলিং ব্যবস্থা উল্টে একটা বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। মামলার আবেদন করতে গিয়ে তাঁদেরকে গার্হস্থ্য ঘটনার প্রতিবেদন (DIR), হলফনামা এবং অন্যান্য সহায়ক প্রমাণপত্র—যেমন বিবাহের সার্টিফিকেট, মেডিকেল রিপোর্ট, যৌথ আর্থিক লেনদেনের প্রমাণস্বরূপ ইউটিলিটি বিল বা জয়েন্ট ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট এবং নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছবি—আপলোড করতে বলা হয়।
এর পাশাপাশি, ভুক্তভোগী ও তাঁদের আইনি প্রতিনিধিদের অনলাইনে শপথ রেকর্ড করা, ডিজিটাল ফর্ম পূরণ করা এবং আদালতের পোর্টালে নথি আপলোড করার মতো বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ধাপও সম্পন্ন করতে হয়। যথাযথ প্রযুক্তিগত সহায়তা বা অবকাঠামো না থাকলে এসব কাজ সম্পন্ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমনকি আদালত চত্বরেও অনেক সময় ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যার কারণে জরুরি ফাইল জমা দিতে দেরি হয়, যা সংকটময় পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে প্রক্রিয়াটি মন্থর গতি নেয়, যার ঝুঁকি হলো—ভুক্তভোগী মহিলারা হয়তো সেই মুহূর্তের জরুরি সাহায্যটুকু আর পাবেন না।
এই পরিস্থিতিতে মামলার আবেদন করার জন্য অনলাইন ও অফলাইন—উভয় পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি হাইব্রিড ব্যবস্থা চালু করা হলে তা ব্যবস্থাটিকে আরও সহজলভ্য করতে পারে। কারণ প্রত্যেকেরই সমান ডিজিটাল দক্ষতা, ইন্টারনেট সুবিধা বা সংকটের মুহূর্তে প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মানসিক দৃঢ়তা থাকে না। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি সরাসরি উপস্থিত হয়ে আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ এবং সহায়ক পরিষেবা চালু থাকলে পুরো ব্যবস্থাটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রতিক্রিয়াশীল এবং সত্যিকারের ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে।
2. সুরক্ষা কর্মকর্তাদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা
রাজ্য সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষা কর্মকর্তা বা ‘পিও’ (PO) নিয়োগ করে। এই আইন ব্যবস্থায় তাঁরাই হলো সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র। একজন সুরক্ষা কর্মকর্তা ভুক্তভোগী মহিলাদের অভিযোগ দায়ের করতে, ঘটনার রিপোর্ট (DIR) তৈরি করতে এবং তাঁদের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, আশ্রয়স্থল ও কাউন্সেলিং-এর সাথে যুক্ত করতে সাহায্য করেন। তাঁরা পুলিশের সাথে যোগাযোগ রাখা, নিরাপত্তার পরিকল্পনা করা এবং কোর্টের কাজ চলাকালীন গাইড হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও, কোর্টের আদেশ ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না এবং স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে বাড়িতে গিয়ে সরেজমিনে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা যাচাই করাও তাঁদের দায়িত্ব।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই অফিসাররা অতিরিক্ত কাজের চাপ ও সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করেন। ফলে তাঁদের ভূমিকা অনেক সময় ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়িয়ে মামলা সামলানো বা নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার কাজের পরিবর্তে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে—যা ভুক্তভোগীদের যথাযথ সহায়তা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
এই আইনটিকে সত্যিকার অর্থে কাজে লাগাতে হলে সুরক্ষা কর্মকর্তাদের দক্ষতা এবং দায়বদ্ধতা বাড়ানো খুব জরুরি। এই জন্য নিয়মিতভাবে জেলা পর্যায়ে পর্যালোচনা বৈঠক করা প্রয়োজন, যাতে এই প্রক্রিয়াগুলি কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা মূল্যায়ন করা যায়। পাশাপাশি অভিযোগ, রিলিফ অর্ডার, নির্দেশ বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং সুরক্ষা কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশকেও সুরক্ষা কর্মকর্তাদের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে হবে, কারণ পুলিশের দেরি বা গাফিলতি ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার পথ আরও কঠিন করে দেয়।

3. সার্ভিস প্রোভাইডারদের স্বীকৃতি দেওয়া
একজন সেবা প্রদানকারী বা সার্ভিস প্রোভাইডার (একজন ব্যক্তি বা সংস্থা হতে পারেন) বিপদগ্রস্ত মহিলাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য, আইনি পরামর্শ বা নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে থাকেন। তাঁদের ভূমিকা অনেকটা সুরক্ষা কর্মকর্তার (PO) মতোই। কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা যাচাই করা এবং তাঁদের কাউন্সেলিং করাও এই সার্ভিস প্রোভাইডারদের দায়িত্ব। তাঁদের ভূমিকা এতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা যথাযথ স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন পান না।
অনেক রাজ্যে এমন অনেক সংস্থা বা ব্যক্তি আছেন যারা এই কাজগুলি করে যাচ্ছেন, যাদের এখনও এই আইনের অধীনে সরকারিভাবে সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। এর ফলে তাঁদের কোনো সরকারি ক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য বা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। সরকারি তকমা না থাকায় পুলিশ, হাসপাতাল বা আদালতের সাথে যোগাযোগ করে কাজ করা তাঁদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাঁদের গৃহীত পদক্ষেপগুলিকে অনেক সময়ই অপরিহার্য বা অত্যাবশ্যকীয় না ভেবে, বরং ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়।
যোগ্য সার্ভিস প্রোভাইডারদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের নিয়োগের ঘোষণা করা এই আইনের কার্যকর বাস্তবায়নকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। এর মাধ্যমে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা সহজ হবে, ভুক্তভোগীর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।
2010 সালে, মুম্বাই কর্তৃপক্ষSNEHA-সহ কয়েকটি অলাভজনক সংস্থাকে এই আইনের অধীনে আনুষ্ঠানিক সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে মনোনীত করেছিল।। এই সংস্থাগুলিকে গার্হস্থ্য ঘটনার প্রতিবেদন (DIR) দাখিল করা, কাউন্সেলিং প্রদান করা এবং ভুক্তভোগীদের আইনি ও চিকিৎসা সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, কোনো আর্থিক সুবিধা ছাড়াই সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করা সার্ভিস প্রোভাইডারদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা কোনো মামলার ভয় ছাড়াই নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন, যা ভুক্তভোগীদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তবে এই নিয়োগের মেয়াদ 2013 সালে শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়া অলাভজনক সংস্থার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আনুষ্ঠানিক মর্যাদা না থাকলেও কিছু সংস্থা এখনও গার্হস্থ্য হিংসার শিকার ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে চলেছে।
4. ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় ধারা 31-এর কার্যকর ব্যবহার
‘গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইন’-এর একটি বিশেষ দিক হলো 31 নম্বর ধারা, যার ব্যবহার খুব কম হয়। এই ধারা অনুযায়ী, যদি আদালতের দেওয়া ‘সুরক্ষা আদেশ’ কেউ অমান্য করে, তবে ভুক্তভোগী মহিলা সরাসরি তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক মামলা শুরু করতে পারেন।
একটি সুরক্ষা আদেশের মূল লক্ষ্য হলো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ভুক্তভোগীর সাথে যোগাযোগ করতে বাধা দেওয়া, যাতে তিনি আর কোনোভাবে অত্যাচারিত না হন। কিন্তু বাস্তবে এই আদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা যায়। অনেক পুলিশ কর্মকর্তারই আইনের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই, যার ফলে ভুলভাবে আইন প্রয়োগের ঘটনা ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, ধারা 31 অনুযায়ী সুরক্ষা আদেশ লঙ্ঘনের ঘটনাকে অনেক সময় ভুলভাবে ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা 498A (বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারা 86)-এর অধীনে নথিভুক্ত করা হয়, যেখানে স্বামী বা তার আত্মীয়দের দ্বারা মহিলার প্রতি করা নিপীড়নকে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই ধরনের ভুল শ্রেণিবিভাগ ভুক্তভোগীদের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে। যখন পুলিশ সঠিক ধারায় মামলা রুজু করে না, তখন মহিলারা সময়মতো সুরক্ষা পান না, তাঁরা শ্বশুরবাড়িতে থাকার অধিকার বা খোরপোশের মতো জরুরি সুবিধাগুলি থেকে বঞ্চিত হন। দ্রুত আইনি সুরক্ষা পাওয়ার বদলে তাঁদের অনেক সময় আপস করতে বা নিজেদের ভেতরকার ঘটনা বলে মিটমাট করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর ফলে তাঁরা বারবার অত্যাচারিত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থেকে যান।
এর পেছনে মূল কারণ হলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং এখনও প্রচলিত সেই ধারণা যে গার্হস্থ্য হিংসা একটি “ঘর কা মামলা” (পারিবারিক বিষয়)। এই মানসিকতার কারণেই সুরক্ষা আদেশগুলি ঠিকমতো মান্য করা হয় না এবং ভুক্তভোগীদের সমস্যার সমাধানে কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। এই সমস্যা দূর করতে হলে পুলিশ ও প্রশাসনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা এবং গার্হস্থ্য হিংসার সূক্ষ্ম দিকগুলি সম্পর্কে সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি এবং PWDVA-এর কার্যকর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির মধ্যে জোরদার সহযোগিতা অপরিহার্য।
পুলিশের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP)-এর মধ্যে ধারা 31 অন্তর্ভুক্ত করা হলে এর প্রয়োগে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে এবং আইন প্রয়োগে সামঞ্জস্য বজায় থাকবে।
এই আইনের উপর নজরদারি বজায় রাখতে এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকারগুলির উচিত নিয়মিত সবাইকে নিয়ে পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা। ‘জনশুনানি’-র মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে ভুক্তভোগী মহিলা, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সুরক্ষা কর্মকর্তা, পুলিশ, বিচার বিভাগীয় দপ্তর এবং মহিলা ও শিশু বিকাশ দপ্তর (DWCD) ও জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ (DLSA)-এর মতো সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলির প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে এই আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করবে। এই ধরনের মাধ্যমগুলি কেবল শাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকরগুলি নজরে আনতেই সাহায্য করে না, বরং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের কাজের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতাও বাড়িয়ে দেয়। সুপ্রিম কোর্ট সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে এই আইন (PWDVA) কার্যকর করার বিষয়ে যে রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে, তা থেকেই বোঝা যায় যে এই ধরনের সম্মিলিত মূল্যায়ন এখন কতটা জরুরি।
5. আইনি প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো
SNEHA নামক সংস্থার আইনি পরামর্শদাতা নাজমুসাহার আসাদি-র মতে, মামলার বিচার প্রক্রিয়া অনেক সময় খুব কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদী হয়। এর ফলে এই আইনের মূল লক্ষ্য—অর্থাৎ ভুক্তভোগীকে দ্রুত সাহায্য করা—তা ব্যাহত হয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “যদিও PWDVA আইনের 28 নম্বর ধারা অনুযায়ী আদালত চাইলে নিয়মকানুন কিছুটা নমনীয় করতে পারে, কিন্তু বিচারকরা অনেক সময় ‘ইন্ডিয়ান এভিডেন্স অ্যাক্ট’-এর নিয়মগুলিকে খুব কঠোরভাবে অনুসরণ করে চলেন। এর ফলে নিজের অভিযোগ প্রমাণ করার সব দায়িত্ব ভুক্তভোগীর ওপরই বর্তায়, যা পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে অনেক সময় খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শেষ পর্যন্ত সবকিছু বিচারকের মর্জির ওপরই নির্ভর করে।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, এই আইনের (PWDVA) অধীনে পাওয়া প্রতিকারসমূহ এবং ব্যক্তিগত আইনের অধীনে পাওয়া প্রতিকারসমূহের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অনেক ক্ষেত্রেই বিচারব্যবস্থাও ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনের গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়। একবার কাউন্সেলিং বা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হওয়ার পরেও বারবার ‘মিডিয়েশন’ বা আপসের জন্য পাঠানো হয়, যার ফলে মামলা ঝুলে থাকে। কিছু আদালতে PWDVA-সংক্রান্ত মামলার শুনানি সপ্তাহে মাত্র একদিন হয়, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায় এবং ভুক্তভোগীদের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
এই সমস্যাগুলি মেটানোর জন্য কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, PWDVA-এর আওতাধীন মামলাগুলির জন্য আলাদা আদালত বা বিচারক নিয়োগ করা প্রয়োজন, যাতে মামলাগুলি গুরুত্ব পায় এবং দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়। এতে সাধারণ আদালতে অতিরিক্ত কাজের চাপ কমবে। দ্বিতীয়ত, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যে) মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্য নিতে হবে। সবশেষে, অপ্রয়োজনীয় বা দীর্ঘায়িত মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া বন্ধ করা জরুরি, বিশেষত সেইসব ক্ষেত্রে যেখানে দ্রুত আইনি সহায়তা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, আশ্রয় বা আর্থিক সহায়তা যখন ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তখন তাঁদেরকে দীর্ঘ মধ্যস্থতার চাপে ফেলা উচিত নয়।

6. নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার নিশ্চিত করা
নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রেই 12 বছরের বেশি বয়সী ছেলে সন্তানদের সঙ্গে মায়েদের থাকতে দেওয়া হয় না। ফলে অনেক মহিলাকেই নিজের নিরাপত্তা এবং সন্তানের সঙ্গে থাকার সুযোগের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয়। আর এই সিদ্ধান্ত যে কোনো মানুষের কাছেই বড় কঠিন। এছাড়া মানসিক সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদী অসুখে ভোগা মহিলাদের জন্য উপযুক্ত আশ্রয়স্থলের বড়ই অভাব। শুধু আশ্রয়ই নয়, অনেক সময় ভুক্তভোগীদের খাবার, পোশাক এবং উপার্জনেরও কোনো পথ থাকে না—বিশেষ করে যদি অত্যাচারী সঙ্গীই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হন। সঠিক সরকারি সাহায্য না থাকলে এই মহিলারা চরম অসহায়তার মধ্যে পড়েন।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যগুলির উচিত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলায় বিনিয়োগ করা, যেখানে সমন্বিত স্বাস্থ্য পরিষেবা ও মানসিক-সামাজিক সহায়তা পাওয়া যাবে। এতে ভুক্তভোগীকেই আর নিজের নিরাপত্তা ও সন্তানের সঙ্গে থাকার সুযোগের মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে না। এইসব আশ্রয়কেন্দ্রে দক্ষ কর্মী থাকা প্রয়োজন যারা আইনি পরামর্শ ও মানসিক শক্তি জোগাতে সহায়তা করতে পারবেন। সেই সাথে সাময়িক আবাসস্থল, শিশুদের পরিচর্যা এবং নির্দিষ্ট মাসিক ভাতার ব্যবস্থা থাকলে এই মহিলারা আবার সম্মানের সাথে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেন।
7. একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা তৈরি করা
গার্হস্থ্য হিংসার মোকাবিলায় স্বাস্থ্য পরিষেবা বা চিকিৎসা ব্যবস্থার ভূমিকা সবথেকে বেশি অবহেলিত হয়। অনেক সময় মারধর বা আঘাতের পর একজন মহিলা প্রথমেই ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে যান। কিন্তু যথাযথ প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট প্রোটোকল বা রেফারেল ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় তাঁরা কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারেন না।
হাসপাতালগুলিতে এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার যেখানে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করে তাঁকে চিকিৎসা প্রদানের পাশাপাশি তাঁকে আইনি ও সামাজিক সাহায্যের পথ দেখানো হবে। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের মতো সরকারি কর্মসূচির সাথে এই বিষয়টিকে যুক্ত করলে সাধারণ চিকিৎসার অংশ হিসেবেই এই সমস্যার সমাধান করা সহজ হবে।
PWDVA একটি যুগান্তকারী আইন হলেও, কোনো আইন ঠিক ততটাই কার্যকরী হয়, যতটা তার প্রয়োগ সফল হয়। আমরা PWDVA-এর তৃতীয় দশকে প্রবেশ করতে চলেছি, এই সময়ে আমাদের সামনে এগোনোর পথ হতে হবে আরও সাহসী এবং এর সাথে আমাদের সুসংগঠিত পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই হবে না, বিচারপ্রার্থী প্রতিটি মহিলার জন্য এই আইনকে একটি দায়বদ্ধ প্রশাসন এবং শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হবে।
এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI.
—
আরও জানুন
- ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা সংঘটিত হিংসার ঘটনার বিশ্বব্যাপী ব্যাপ্তি সম্পর্কে জানুন।
- মহিলা গৃহকর্মীরা কীভাবে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, সে সম্পর্কে এই নিবন্ধটি পড়ুন।
- ভারতে লিঙ্গ-ভিত্তিক হিংসার ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানুন।






