2016 সাল পর্যন্ত ভারতে প্রতিবন্ধী সংক্রান্ত প্রধান আইন ছিল পার্সন উইথ ডিজেবিলিটি অ্যাক্ট, 1995। এই আইনটি তৈরি করা হয়েছিল যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা জীবনের সব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পান এবং সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন সেই কথা মাথায় রেখে। এই আইনে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা (অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশন) এবং বৈষম্যহীনতার কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিবন্ধকতা নির্ণয়ের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়। এছাড়াও প্রতিবন্ধী সংক্রান্ত নীতি বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরে আলাদা সংস্থা গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
ভারত 2007 সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘের একটি চুক্তি অনুমোদন করে। সেই চুক্তির সঙ্গে ভারতের আইনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে 1995 সালের প্রতিবন্ধী আইনটি বাতিল করে তার পরিবর্তে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আইন (RPwD Act), 2016 আইন চালু করা হয়।
এই আইনটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধকতার আইনি সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করেছে। 1995 সালের আইনে প্রতিবন্ধকতা বলতে যা বোঝানো হয়েছিল তা হলো “দৃষ্টিহীনতা, কম দৃষ্টিশক্তি, কুষ্ঠরোগ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তি, শ্রবণ শক্তিহীন ব্যক্তি, চলন প্রতিবন্ধকতা, মানসিক প্রতিবন্ধকতা এবং মানসিক অসুস্থতা”। তবে 2016 সালের আইনটি পুরনো আইনে উল্লিখিত প্রতিবন্ধকতাগুলির পাশাপাশি মোট 21 ধরণের প্রতিবন্ধকতাকে স্বীকৃতি দেয়। এর পাশাপাশি, এটি অ্যাসিড হামলার শিকার ব্যক্তিদের চলন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এছাড়াও, এই আইনটি বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট এবং বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে। এই শ্রেণির মধ্যে এখন শেখার সমস্যা (লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি) এবং অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও, আইনটি দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে হওয়া প্রতিবন্ধকতাকেও স্বীকৃতি দেয়। যেমন— স্নায়বিক রোগের মধ্যে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এবং পারকিনসন রোগ, আর রক্তের রোগের মধ্যে হিমোফিলিয়া, থ্যালাসেমিয়া এবং সিকেল সেল রোগ। সবশেষে, একাধিক প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যক্তিদেরও এই আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যেমন শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিহীন (ডেফব্লাইন্ড) ব্যক্তিরা।
RPwD আইনের অধীনে কিছু অধিকার ও সুবিধা শুধুমাত্র ‘বেঞ্চমার্ক প্রতিবন্ধকতা’ থাকা ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য। বেঞ্চমার্ক প্রতিবন্ধকতা বলতে বোঝায়, যাঁদের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতার মাত্রা অন্ততপক্ষে 40 শতাংশ বা তার বেশি রয়েছে। কোনও ব্যক্তি বেঞ্চমার্ক প্রতিবন্ধী হিসেবে বিবেচিত হবেন কি না, তা নির্ধারণ করে একটি অনুমোদিত সার্টিফাইং কর্তৃপক্ষ। সাধারণত এই কাজের দায়িত্বে ন্যস্ত থাকে কোনও হাসপাতাল বা রাজ্য কিংবা জেলা স্তরের মেডিক্যাল বোর্ডের উপর।
RPwD আইন দ্বারা কীসের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়?
এই আইনের মাধ্যমে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও ভাতা, এবং বিনোদন ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিষয়ে কিছু বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
শিক্ষা
এই আইনের তৃতীয় অধ্যায় অনুযায়ী, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের ক্যাম্পাসগুলি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহজগম্য করতে হবে এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুবিধাও দিতে হবে। এর লক্ষ্য হলো এমন সহায়তা দেওয়া, যাতে সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত ও সামাজিক বিকাশ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এই আইন শিশুদের শেখার প্রতিবন্ধকতাযত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করার নির্দেশও দেয়। পাশাপাশি, শেখার প্রতিবন্ধকতাও বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতায় ভোগা শিশুদের শ্রেণিকক্ষে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়াও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসন—অর্থাৎ পঞ্চায়েত বা পুরসভা—প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি সমীক্ষা চালাবে, যাতে প্রতিবন্ধী শিশুদের চিহ্নিত করা যায়। এই তথ্য সংগ্রহ করার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সহজ হবে। শ্রেণিকক্ষকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে এই আইনে বলা হয়েছে—বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী শিশুদের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, প্রতিবন্ধী শিক্ষক, এবং ব্রেইল ও সাংকেতিক ভাষায় (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ) দক্ষ শিক্ষকদের নিয়োগ করতে হবে। এছাড়াও, সাংকেতিক ভাষা ও ব্রেইলের মতো বিকল্প যোগাযোগ পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যাতে বাক, যোগাযোগ বা ভাষা-সম্পর্কিত প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরাও অংশগ্রহণ করতে পারেন।
আইনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বেঞ্চমার্ক প্রতিবন্ধকতা থাকা শিশুদের জন্য কিছু বিশেষ সুবিধার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—18 বছর বয়স পর্যন্ত যে কোনও সরকারি স্কুল বা বিশেষ বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে শিক্ষা, বিনামূল্যে শিক্ষাসামগ্রী, এবং বৃত্তি প্রদান। এছাড়াও সরকার পরিচালিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেঞ্চমার্ক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কমপক্ষে 5 শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখতে হবে। পাশাপাশি, ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে বয়সসীমায় পাঁচ বছর ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এই আইনটি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানেরও সুপারিশ করে।
দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান
আইনের চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কতটা সুযোগ পাচ্ছেন—তা নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, একাধিক প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যক্তি এবং বৌদ্ধিক ও বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তৈরি করা প্রয়োজন, যা সরাসরি চাকরি বা বাজারের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এছাড়াও, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিতে পারেন বা স্বনির্ভর হতে পারেন, তার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গোয়ায় একটি রাজ্যভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী পেশা ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি মাসে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
শিক্ষার মতো, কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিষয়েও এই আইনের অধিকাংশ নির্দেশ মূলত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আইনটির 20 নম্বর ধারায় কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি কোনো ধরণের বৈষম্য না করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, সরকারি দপ্তরগুলিকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং বাধামুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করতে বলা হয়েছে, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নির্বিঘ্নে ও কার্যকরভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এছাড়াও, কোনও সরকারি কর্মচারী যদি তাঁর চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রতিবন্ধী হয়ে যান, তাহলে তাঁর পদাবনতির বা তাঁকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করার প্রয়োজন নেই, বরং তাঁকে একই বেতনক্রমের অন্য কোনও উপযুক্ত পদে বদলি করা যেতে পারে।
আইনের 21 নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে অবশ্যই সমান সুযোগের নীতি কার্যকর থাকতে হবে। পাশাপাশি, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য 22 নম্বর ধারায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে চাকরি সংক্রান্ত সব বিষয়ে নিয়মিত নথি সংরক্ষণ করতে হবে। এই নথির মধ্যে প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থীদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়াও, প্রয়োজন হলে এই নথিগুলি যে কোনো সময় পরিদর্শন করা যেতে পারে।
আইনের ষষ্ঠ অধ্যায়ের 33 নম্বর ধারা অনুযায়ী, সরকারি চাকরির মোট পদের মধ্যে 4 শতাংশ পর্যন্ত পদ বেঞ্চমার্ক প্রতিবন্ধী আবেদনকারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। যদিও এই আইনে বেসরকারি সংস্থাগুলিকে ইনসেনটিভ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তবে সেই ইনসেনটিভ বা সুবিধাগুলি ঠিক কী হবে—তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এছাড়াও, সরকারি ভবনের নকশা বা পরিকল্পনাগুলি শুধুমাত্র তখনই অনুমোদন করা হবে, যখন সেগুলি এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সহজে সেই ভবনে প্রবেশ করতে, চলাচল করতে এবং প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন। আইনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে বিদ্যমান সব সরকারি ভবনকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে এমনভাবে উপযোগী করে তুলতে হবে, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল বা পরিষেবা গ্রহণে কোনো বাধা না থাকে।

স্বাস্থ্যসেবা ও ভাতা
আইনের পঞ্চম অধ্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বসবাসের কাছাকাছি এলাকায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান নিশ্চিত করা, সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমন ব্যবস্থা রাখা যাতে তাঁরা সহজে সেখানে প্রবেশ করতে ও চলাচল করতে পারেন, এবং চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া। এছাড়াও, স্বাস্থ্যপরিষেবার মান উন্নত করা এবং নতুন করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমানোর জন্য বিভিন্ন প্রকল্প চালু করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, 2021 সালে ভারত সরকার দেশজুড়ে একটি রোগ নির্মূল কর্মসূচি চালু করে, যার লক্ষ্য ছিল ম্যালেরিয়া, গোদ (লিম্ফ্যাটিক ফাইলেরিয়াসিস) এবং কালাজ্বর নির্মূল করা।
এই আইনে প্রতিবন্ধকতা প্রতিরোধের জন্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেমন—প্রতিবন্ধকতা কীভাবে হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে তা জানার জন্য নিয়মিত সমীক্ষা, তদন্ত ও গবেষণা পরিচালনা করা। পাশাপাশি, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করার জন্য প্রতি বছর শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা আয়োজন করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, আইন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয়, অঙ্গনওয়াড়ি ইত্যাদি সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রচার চালাতে হবে।
এই আইনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট আয়সীমার মধ্যে থাকা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে সহায়ক সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দিল্লি ও পঞ্জাবের মতো কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যেই এই ধরণের প্রকল্প চালু করেছে, যার মাধ্যমে বেঞ্চমার্ক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় সহায়ক যন্ত্রপাতি পেতে পারেন। আইনে প্রতিবন্ধী ভাতা এবং যাঁদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন, তাঁদের জন্য পরিচর্যাকারী ভাতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, প্রতিবন্ধকতার সাথে জীবনযাপনের কারণে যে অতিরিক্ত খরচ হতে পারে, তা বিবেচনা করে সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের অধীনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় 25 শতাংশ বেশি ভাতা পাওয়ার অধিকারী।
বিনোদন ও সাংস্কৃতিক জীবন
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও সম্মানজনক জীবনযাপন এবং সাংস্কৃতিক জীবনে অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে—এ বিষয়টি স্বীকার করে আইনটির পঞ্চম অধ্যায়ের 29 নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, তাঁদের জন্য বিনোদনমূলক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এই ধারায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—প্রতিবন্ধকতার ইতিহাস নিয়ে একটি জাদুঘর তৈরি করা, প্রতিবন্ধী শিল্পীদের জন্য অনুদান ও স্পনসরশিপের ব্যবস্থা করা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শিল্পকলা সহজলভ্য করা, সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং শিল্পকলার পাঠ্যক্রম এমনভাবে বদলানো যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও অংশ নিতে পারেন।
সরকারের দায়িত্বগুলো কী কী?
1. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ
এই আইনটিতে প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে একটি তথ্য-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তাই বিভিন্ন সংস্থাকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি দপ্তর এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আইনটি জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকেও (NDMA) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি নথিভুক্ত তালিকা রাখতে বলেছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁদের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করা যায়। NDMA-কে এমনভাবে তথ্য প্রচার করার কথাও বলা হয়েছে, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহজলভ্য হবে। এছাড়াও, দুর্যোগের পর পুনর্গঠন পরিকল্পনার সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
2. সবার জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য পরিবেশ ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা
এই আইনে বলা হয়েছে, স্কুল, সরকারি দপ্তর, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং গণপরিবহণসহ সব ধরণের জনসমাগমস্থলকে সকলের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে হবে। এছাড়াও, ভোটকেন্দ্রগুলিকে এমনভাবে সাজানোর কথা বলা হয়েছে যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সহজে সেখানে প্রবেশ করতে পারেন এবং নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। পাশাপাশি সরকারি নথি ও প্রকাশনাগুলিকে এমনভাবে তৈরি ও প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও সেগুলি সহজে পড়তে, বুঝতে এবং ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ আরও বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও তা নথিভুক্ত করাও অন্তর্ভুক্ত।
3. কর্মকর্তা নিয়োগ, উপদেষ্টা সংস্থা ও বিশেষ আদালত
এই আইনটির কার্যকারিতা সঠিকভাবে বজায় রাখার জন্য আইনটিতে বিভিন্ন সরকারি পদ তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। যেমন, প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকা বাধ্যতামূলক। চাকরির জন্য আবেদন করার সময় কেউ যদি বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তিনি সেই কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। সেখান থেকেও সন্তোষজনক সমাধান না পেলে, তিনি প্রতিবন্ধীদের জন্য জেলা স্তরের কমিটির কাছেও অভিযোগ জানাতে পারবেন।
এই আইনের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় প্রতিবন্ধী উপদেষ্টা বোর্ড এবং প্রতিটি রাজ্যে একটি করে রাজ্য প্রতিবন্ধী উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই বোর্ডগুলিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক এবং দপ্তরের প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে থাকেন। এছাড়াও, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের যুগ্ম সচিবরা এবং প্রতিবন্ধী বিষয়ক বিশেষজ্ঞরাও এই বোর্ডগুলির সদস্য হন। আইনে আরও বলা হয়েছে, বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য অবশ্যই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মহিলা, এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি (SC/ST) সম্প্রদায়ের হতে হবে। এই বোর্ডগুলি প্রতি ছয় মাস অন্তর বৈঠক করে খতিয়ে দেখে, সরকার যে নীতিগুলি গ্রহণ করছে সেগুলিতে প্রতিবন্ধী আইনটির উদ্দেশ্য ও নির্দেশনা কতটা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে।
এই আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একজন মুখ্য কমিশনার এবং প্রতিটি রাজ্যে রাজ্য কমিশনার (অভিযোগ নিষ্পত্তির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যার কাছে রিপোর্ট করেন) নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এই কমিশনারদের ক্ষমতা দেওয়ানি আদালতের মতোই। তাঁদের দায়িত্ব হলো গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া, এবং বিদ্যমান আইন ও বিধানগুলি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। যদি কোনও আইন বা ব্যবস্থা উপযুক্ত না হয়, তাহলে তাঁরা প্রয়োজনীয় সুপারিশও করতে পারেন। মুখ্য কমিশনার বা রাজ্য কমিশনারের করা যেকোনো সুপারিশের ওপর তিন মাসের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এই আইন অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার দ্রুত ও সঠিকভাবে করার জন্য একটি বিশেষ আদালত গঠন করতে হবে। পাশাপাশি, এই ধরণের মামলার পরিচালনার জন্য বিশেষ সরকারি অভিযোক্তা (পাবলিক প্রসিকিউটর) নিয়োগ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
2016 সালের আইনটি কীভাবে অন্য আইনের থেকে আলাদা?
1995 এবং 2016, দুটি আইনেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ এবং নথিভুক্তকরণ, সহজলভ্য শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যপরিষেবা ও কর্মসংস্থান, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রতিবন্ধী আইনের বাস্তবায়ন সম্পর্কিত বিষয়টি তদারকির জন্য বিশেষ সরকারি কার্যালয়ের বিধান রয়েছে। দুটি আইনেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে এবং প্রতিবন্ধকতা প্রতিরোধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও রয়েছে।
তবে, 2016 সালের আইনটি কয়েকটি দিক থেকে আলাদা।
1. অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি
এই আইনটি শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজে অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা পাওয়ার অধিকারই নিশ্চিত করে না, বরং শিল্প-সংস্কৃতি ও বিনোদনমূলক কাজে অংশ নেওয়ার অধিকারকেও স্বীকৃতি দেয়। পাশাপাশি, এই আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার অধিকার, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে থেকে জীবন কাটানোর সুযোগ, এবং নিজের পরিচর্যাকারী নিজে বেছে নেওয়ার অধিকারও উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আরও বেশি স্বাধীনতা দেওয়া এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
এই আইনে প্রতিবন্ধী সমাজের ভেতরেও যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা স্বীকার করা হয়েছে—যেমন লিঙ্গ, বয়স এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে পার্থক্য। এছাড়াও , প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে ভালোভাবে বোঝার জন্য এবং উপযুক্ত নীতি তৈরির উদ্দেশ্যে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও এই আইনটি স্পষ্টভাবে বলেছে যে কোনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তাঁকে গবেষণার অংশ করা যাবে না।
2. স্পষ্ট আইনগত বিধান ও অভিযোগ সমাধানের ব্যবস্থা
1995 সালের আইনে অন্তর্ভুক্তি ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে কিছু নির্দেশ, যেমন সরকারি ভবনগুলিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার আয়োজন করার উল্লেখ থাকলেও—2016 সালের আইনটি এই ধরণের কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে আরও সুনির্দিষ্ট বিধান তৈরি করেছে।
1995 সালের আইনে অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট কোনও শাস্তির কথা স্পষ্টভাবে বলা ছিল না। সেক্ষেত্রে শাস্তি কী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করত সংশ্লিষ্ট মামলার বিচারকের সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু 2016 সালের আইনটিতে অপরাধের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন, এই আইনের আওতায় প্রথমবার অপরাধ করলে 10,000 টাকা জরিমানা করা হবে। একই অপরাধ আবার করলে জরিমানার পরিমাণ হতে পারে 50,000–5 লক্ষ টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও, কেউ যদি জালিয়াতি করে এই আইনের সুবিধা নেয়, তাহলে তাঁর জরিমানা ছাড়াও কারাদণ্ডও হতে পারে।
বর্তমান অবস্থা
এই আইনে সরকারি ও অন্যান্য ভবনগুলিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী করে তোলার নির্দেশ থাকলেও, কেন্দ্রীয় প্রতিবন্ধী উপদেষ্টা বোর্ডের সাম্প্রতিক বৈঠকে জানানো হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে এই কাজের অগ্রগতি এখনও যথেষ্ট ধীর। বিশেষ করে পুরনো ভবনগুলিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন (রেট্রোফিটিং) করার কাজ বহু জায়গায় সঠিকভাবে এগোয়নি। পাশাপাশি, এই খাতে তহবিল বরাদ্দও এখনও যথেষ্ট নয়। এছাড়াও, আইনে কাউকে প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তিনি যে সব সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন—বাস্তবে সব ক্ষেত্রে তার নিশ্চয়তা নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অ্যাসিড হামলার শিকার ব্যক্তিদের এই আইনে প্রতিবন্ধী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেট পাওয়া, চাকরির সুযোগ, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং ভর্তুকি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের এখনও অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মীদের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন সম্পর্কে পর্যাপ্ত সংবেদনশীলতা বা সচেতনতা দেখা যায় না। তাছাড়া প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণও অনেক সময় এতটাই কম হয় যে, তা প্রকৃতপক্ষে সুবিধাভোগীদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না।
যদিও, সমাজে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে আরও বেশি সংখ্যক প্রতিবন্ধকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া একটি অত্যাবশ্যকীয় প্রথম পদক্ষেপ। যদিও ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে এবং সমাজকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন, তবুও মুখ্য কমিশনার, নির্বাচন কমিশন এবং বোম্বে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায় ও নির্দেশিকাগুলি প্রমাণ করে যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমস্যা ও দাবিগুলি এখন আগের তুলনায় আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI।
—
আরও জানুন
- প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সম্পর্কিত ভারতের জাতীয় নীতিটি এখানে পড়ুন।
- প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ‘সহানুভূতিশীল বৈষম্য’ (বেনেভোলেন্ট এবলিজম) কীভাবে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে—তা জানতে এই লেখাটি পড়ুন।
- 2016 সালের প্রতিবন্ধী আইনে ভবন ও পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে যে বাধামুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করার নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে—তা জানতে এই লেখাটি পড়ুন।
- প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজে কী ধরণের মানসিক ও দৃষ্টিভঙ্গিগত বাধার সম্মুখীন হন—সেই বিষয়ে জানতে এই লেখাটি পড়ুন।






