সামাজিক খাতের কাজ শুধু পরিষেবা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মানুষকে নিজেদের অধিকার বুঝতে ও সেই অধিকার দাবি করতে শেখানোই হলো আসল কাজ।

READ THIS ARTICLE IN

7 min read

ভারতের উন্নয়নের সফর প্রায়শই দুই ধরণের পদ্ধতির মধ্যে দোলাচলে থেকেছে। একদিকে আছে সমাজকল্যাণমূলক মডেল, যেখানে সরকার নিজের বিবেচনা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ঠিক করে বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প চালায়। অন্যদিকে আছে অধিকারভিত্তিক পদ্ধতি, যেখানে মানুষের অধিকার আইন দ্বারা নিশ্চিত করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সম্মিলিত লড়াই ও জনগণের চাপের ফলেই সেই অধিকার সুরক্ষিত হয়। যদিও, ভারতের সংবিধান মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য যে ন্যূনতম মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে, বাস্তবে তার সঙ্গে এখনও অনেক বড় ফারাক রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, নীতি ও আইন অনেক সময়ই যথেষ্ট হয় না, সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছায় না, কিংবা সঠিকভাবে কার্যকরও হয় না। এই কারণেই উন্নয়নের এই ঘাটতি পূরণ করতে নাগরিক সমাজ ও জনভিত্তিক সংগঠনগুলোকে প্রায়শই এগিয়ে আসতে হয়।

এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে, যার মুখোমুখি যৌথ সংগঠন, আন্দোলন, অলাভজনক সংস্থা ও তহবিল সংগ্রহ–সংক্রান্ত কাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা প্রায়শই হয়ে থাকি। উন্নয়নের এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি—জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা এবং অধিকার নিশ্চিতকরণ—এর মধ্যে আসলে পার্থক্য কী, আর সামাজিক ক্ষেত্রে এগুলি কীভাবে প্রয়োগ করা হয়? এই নিবন্ধে, আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করব যে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন বিষয়ক ধ্যানধারণকে গড়ে তোলে এবং ন্যায়সঙ্গত ও সমতাপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য কর্মরত সংস্থাগুলির কাছে এর অর্থ কী।

‘দায়বদ্ধতাভিত্তিক’ সামাজিক কল্যাণ বনাম অধিকারভিত্তিক প্রাপ্যতা

সমাজকল্যাণ বলতে সাধারণত রাষ্ট্রের তৈরি এমন কিছু নীতি, পরিকল্পনা ও কর্মসূচিকে বোঝায়, যেগুলি তৈরি করা হয়েছে প্রান্তিক মানুষদের সাহায্যের জন্য। অনেক সময় এসব উদ্যোগকে দান বা উদারতার কাজ হিসেবেই তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে খাদ্য বণ্টন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, এবং কর্মসংস্থানসহ নানা ধরণের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত। দুর্ভাগ্যবশত, জন কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি আইনত বাধ্যতামূলক অধিকার হিসাবে নয় বরং সরকারের ইচ্ছার ভিত্তিতে প্রদত্ত পরিষেবা হিসাবেই কাজ করে এসেছে। এর ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে প্রায়শই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বাদ পড়ে যান, প্রশাসনিক জটিলতার এবং পদ্ধতিগত ব্যর্থতার মুখে পড়েন।

What is IDR Answers Page Banner

ঐতিহাসিকভাবে, এই কল্যাণমূলক উদ্যোগগুলি সাধারণত সময়ই দুর্ভিক্ষ বা খরার মতো সংকটকালে মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য ত্রাণ কর্মসূচির মতো সাময়িক সমাধান হিসেবে গণ্য করা হতো। এসব কর্মসূচি পুরোপুরি সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করত—কখন শুরু হবে, কতদিন চলবে, আর কারা এর সুবিধা পাবে, সবই সরকার ঠিক করত। মৌলিক চাহিদাগুলিকে অধিকারের থেকে আলাদা করে দেখার সমস্যা হলো, যদি এমন করা হয় তাহলে প্রতিটি নাগরিকের যে কাঠামোগত বৈষম্যমুক্ত এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আছে; যার অভাবে মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্রতা, এবং বঞ্চনার শিকার হয়, তার উপর গুরুত্ব না দিয়ে রাষ্ট্রকে শুধু ‘বিনামূল্যে সুবিধা’ প্রদানকারী সংস্থা হিসেবেই দেখা হবে।

এর বিপরীতে, অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জনকল্যাণকে আইনগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা রাষ্ট্রকে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করার জন্য দায়বদ্ধ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, মানুষের ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখতে যে পরিষেবাগুলি প্রয়োজন হয়, সেগুলিকে আর এককালীন সাহায্য হিসেবে দেখা হয় না। বরং এগুলি স্থায়ী অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা হয়—যেখানে মানুষ অধিকারভোগী, আর রাষ্ট্র সেই অধিকার পূরণের জন্য দায়বদ্ধ। এই অধিকারভিত্তিক মডেলটি সংবিধানের প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক অধিকারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

অধিকার-ভিত্তিক পদ্ধতিগুলি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে এগুলির প্রাসঙ্গিকতা

কিন্তু নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলির (CSOs) জন্য অধিকারভিত্তিকভাবে কাজ করার মানে কী? অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব যখন রাষ্ট্রের, তখন এই সংগঠনগুলি এই পথে কেন এগোবে?

উন্নয়ন যেন কখনোই সামাজিক বা অর্থনৈতিক অধিকার লঙ্ঘন না করে।

সংবিধান অনুযায়ী দায়বদ্ধ হলেও বাস্তবে রাষ্ট্রের কাজ অনেক সময় রাজনৈতিক উদাসীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যবস্থাগত বঞ্চনার কারণে সীমিত হয়ে পড়ে। তাই, পরিবর্তন বজায় রাখতে হলে সংস্থাগুলিকে শুধুমাত্র পরিষেবা প্রদান করলেই হবে না, বরং তাদের জনগণের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর গড়ে তোলা, সমালোচনামূলক ও বিচারবোধসম্পন্ন চেতনা তৈরি করা এবং সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতায় বিনিয়োগ করতে হবে। অধিকারভিত্তিকভাবে কাজ করার মানে হলো ‘সচেতনতা‘ তৈরি করার উদ্দেশ্যে নিবিষ্টভাবে কাজ করে যাওয়া—জনগণকে বুঝতে সাহায্য করা যে গণতন্ত্রে তাঁরা প্রত্যেকেই অধিকারভোগী। এর অর্থ কেবল ঘাটতি পূরণ করা নয় বরং অন্যায্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যাতে সম্প্রদায়গুলি তাঁদের নিজস্ব শর্তে রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাইতে পারে।

মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতির পরিধি অনেক সময়ই জনআন্দোলন আর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লাগাতার সমর্থন ও চাপের কারণেই আরও বিস্তৃত হয়েছে। সূচনা এবং রোজগার অধিকার অভিযান এবং এরকম অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত পরশ বানজারা বলেছেন, সামাজিক সুরক্ষাগুলিকে যখন অধিকার হিসেবে আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারে এবং অধিকার অস্বীকার হলে প্রতিকারও দাবি করতে পারে। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের দয়া নয়, বরং জনগণের সংগঠিত লড়াই সরকারকে অধিকারভিত্তিক আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর করতে বাধ্য করেছে। জনগণের নেতৃত্বে চলা এই আন্দোলনগুলির ফলেই শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, বন অধিকার, গার্হস্থ্য হিংসা থেকে সুরক্ষা এবং জাতপাতভিত্তিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অধিকারভিত্তিক আইন প্রণয়ন সম্ভব হয়েছে।”

donate banner

উদাহরণ হিসেবে মনরেগা (MGNREGA) আইনের কথা বলা যায়। এই আইনটি জীবনের অধিকার এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ 41 থেকে উদ্ভূত, যেখানে বলা হয়েছে যে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে সামাজিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। কারণ কাজ ছাড়া মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। এই আইন পাশ করানোর জন্য দেশের নানা প্রান্তের সংগঠন ও প্রচারকারী দলগুলি একত্রিত হয়ে একটি বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, যার নাম ছিল NREGA সংগ্রাম মোর্চা। শুধু আইন পাশ করানোই নয়, এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য মোর্চাটি আজও সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছে।

CSO-এর ক্ষেত্রে অধিকারভিত্তিক পদ্ধতিগুলি শুধু উন্নয়নের ফলাফল নিয়ে ভাবেনা, বরং সেই ফলাফল কীভাবে অর্জিত হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াটিকেও সমান গুরুত্ব দেয়। সে সমস্ত উন্নয়নমূলক মডেলের মতো নয়, যেগুলি শুধুমাত্র লক্ষ্যমাত্রা আর সংখ্যার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। অধিকারভিত্তিক পদ্ধতির মূল নীতি হলো—উন্নয়নের নামে যেন কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক অধিকার লঙ্ঘিত না হয় অথবা বৈষম্য আরও তীব্র না হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যদি লক্ষ্য হয় দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনা, তাহলে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, যেখানে অধিকারগগুলি ক্রমাগত খর্ব হচ্ছে, সেখানে সংগঠনগুলি তাদের কাজের মধ্যে আরও অধিকার-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে বজায় রাখা যায় তা নিয়ে চিন্তা করতে পারে। এই প্রসঙ্গে নিজেদের কাজ পর্যালোচনা করার জন্য তারা নিজেদের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে পারে।

The image features a group of children sitting in a circle. There is a model of a globe in the middle and the children are pointing at different locations._Rights-based development
অধিকার-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এই নীতিকে সমর্থন করে যে উন্নয়ন অবশ্যই সামাজিক বা অর্থনৈতিক অধিকার লঙ্ঘন করবে না বা বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে না। | ছবির সৌজন্যে: সাবা কোহলি দাভে

1. প্রান্তিক ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের আমরা আসলে কীভাবে দেখি?

জনকল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রায়শই প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলিকে নিস্ক্রিয় গ্রহীতা হিসেবে দেখা হয়। এই ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভাষা থেকেই এটি স্পষ্ট হয়ে যায়: যেমন ‘লক্ষ্য’, ‘সুবিধাভোগী’, এমনকি ‘সহায়তা’। এই ধরণের ভাষা ও ভাবনা শুধু ক্ষমতার স্তরবিন্যাসকে আরও শক্তিশালী করে না, বরং যাঁরা ব্যবস্থাগত অবিচারের কারণে ‘উন্নয়ন’-এর সুবিধা থেকে বাদ পড়েছেন, তাঁদের অধিকারভোগী মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল বিতরণ ব্যবস্থার একেকটা সংখ্যায় পরিণত করার ঝুঁকিও তৈরি করে।

জাত, শ্রেণি, লিঙ্গ, ধর্ম, প্রতিবন্ধকতা বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়গুলির সঙ্গে কাজ করা অলাভজনক সংস্থাগুলির উচিত নিজেদের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন করা—আমরা কেন এই মানুষগুলির জন্য কাজ করছি? শুধু কি এই কারণে যে এখন তাঁদের “সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ” বলে দেখা হচ্ছে? নাকি আরও গভীরে তাকালে বোঝা যাবে, একই কাঠামো একদিকে কিছু মানুষকে সুবিধা দেয়, আর অন্যদিকে এই সম্প্রদায়গুলিকেই বারবার বঞ্চিত করে? অধিকারভিত্তিক কাজ করতে গেলে এই আত্মসমালোচনামূলক ভাবনা জরুরি—এবং কেবল দান নয়, ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার জরুরী।

এছাড়াও, অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি সেই সব ঐতিহাসিক অবিচার আর প্রশাসনিক বঞ্চনাকে স্বীকার করে, যেগুলো থেকেই আজকের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এর একটি শক্তিশালী উদাহরণ হলো বন অধিকার আইন (Forest Rights Act)। এই আইনটি রাষ্ট্রের বন একত্রীকরণের সময় আদিবাসী ও বনবাসী সম্প্রদায়গুলির জমি ও সম্পদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার যে ঐতিহাসিক ভুল হয়েছিল, তা সংশোধনের একটি আইনি প্রচেষ্টা। এই অধিকারগুলিকে স্বীকৃতি দিয়ে আইনটি বহু দশক ধরে চলা প্রান্তিকীকরণ ও উচ্ছেদের মতো ভুল সংশোধন করেছে। সাবিত্রী ফাতিমা ফাউন্ডেশন ফর ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট–এর প্রতিষ্ঠাতা সাবাহ খান–এর মতে, “অধিকারভিত্তিক কাজের মধ্যে অনেক সময় কঠিন প্রশ্ন করা এবং এতে মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাওয়া মানুষগুলির দাবি জড়িত থাকে – এগুলি সেই সমস্ত দাবি যেগুলি ভারতের সংবিধানের ভিত্তিতেই তৈরি। খাদ্যের ক্ষেত্রে, একটি জনকল্যাণমূলক বা দাতব্য মডেল খাবারের প্যাকেট বা খাবার বিতরণ করবে।

অধিকারভিত্তিক মডেল বলতে বোঝায় এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁরা তাঁদের কাজের জন্যজবাব দিতে বাধ্য থাকে। এটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এমনভাবে সচেতনতা গড়ে তোলে, যাতে মানুষ নিজের অধিকারের দাবি নিজেই করতে পারে এবং সেই অধিকারগুলি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তার উপর নজরদারি করতে পারে। প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদি সংকটকালীন ব্যবস্থাও নেওয়া হয়, তবে সেগুলি দীর্ঘমেয়াদি অধিকার নিশ্চিত করার পথের অংশ হিসেবেই দেখা হয়। এর একটি উদাহরণ হলো মহারাষ্ট্রের রেশনিং ক্রুটি সমিতি। এই সংস্থাটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইনের আওতায় পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের (PDS) মাধ্যমে খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি পণ্যের বণ্টন নিশ্চিত করতে কাজ করে। একই সঙ্গে, এই সংস্থা চায় যেন কাজের নিয়ম যেন আরও স্বচ্ছ হয় আর সবাই নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে।

2. নেতৃত্বের মধ্যে কী কী অন্তর্ভুক্ত আছে?

অধিকার-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে যে সামাজিক ক্ষেত্র এবং উন্নয়নের পরিসরে আমাদের নিজস্ব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন, বিশেষ করে যখন আমরা বিশেষ সুবিধার অধিকারী। আমরা কি নিম্ন শ্রেণী থেকে আসা প্রকৃত নেতৃত্বের জন্য জায়গা তৈরি করছি, নাকি আমরা সেবার আড়ালে শ্রেণিবিন্যাসকেই শক্তিশালী করছি? অনেক সময় দেখা যায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকা মানুষরা — যাঁরা সাধারণত সুবিধাপ্রাপ্ত জাত, শ্রেণি বা লিঙ্গের — তাঁরাই শুধু পরিচিতি, সুযোগ আর গুরুত্ব পান, অন্যদের কথা বা অবদান চোখে পড়ে না।

অধিকারভিত্তিক নেতৃত্ব সেই মানুষদের কেন্দ্র করে (অথবা খুব সামান্যভাবে অন্তর্ভুক্ত করে) যাঁরা সমস্যার দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত—কারণ তাঁদের রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, এবং স্থানীয় জ্ঞান। যাঁরা বৈষম্য, অবিচার বা বঞ্চনা নিজেরা ভোগ করেননি, তাঁদের হাতে নেতৃত্ব কেন্দ্রীভূত হলে অনেক সময় উদ্দেশ্য সৎ হলেও সেই কাঠামোগত সমস্যাগুলির পুনরুৎপাদন হতে পারে যার সমাধান তাঁরা করার চেষ্টা করছেন।

এই নীতিটি শুধু ব্যক্তিগত প্রতিনিধিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, বরং সংগঠনের সামগ্রিক সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত শ্রেণীর মানুষদের সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কি ব্যবস্থাগুলিকে তৈরি করা হচ্ছে? সংগঠনের নিয়মকানুন, ভাষা ও কাজের রীতিনীতি কি সবার জন্য সহজবোধ্য ও ন্যায্য? আরও কিছু জরুরি প্রশ্ন আছে, যেমন সংগঠনের মধ্যে কার কোন পদের দায়িত্ব গ্রহণের অধিকার আছে? কারা মাঠে নেমে কাজ করছেন, আর কারা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক মঞ্চে সংগঠনের মুখ হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন? কে কত বেতন পান? এই প্রশ্নগুলো শুধু দক্ষতা নিয়ে নয়; এগুলি আসলে বোঝাতে সাহায্য করে যে একটি সংগঠন কীভাবে সমতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারকে বাস্তবে রূপ দেয়।

নাগরিক সমাজ মূলধারার সমাজেরই প্রতিফলন। তাই অন্য অনেক বেসরকারি সংস্থার মতো এখানেও ইতিবাচক পদক্ষেপের অভাবে বহু সংগঠন—কাজের ক্ষেত্র যাই হোক না কেন—প্রভাবশালী জাতি, উচ্চবিত্ত, ইংরেজিভাষী, সুস্থ দেহের অধিকারী, সিসজেন্ডার বা বিষমকামী মানুষের হাতেই পরিচালিত হয়। এটা সব সময় কোনো সংগঠনের অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত নাও হতে পারে—বিশেষ করে শুরুর দিকে। কিন্তু যদি কোনো সংস্থা বছরের পর বছর প্রান্তিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করেও সেই সম্প্রদায় থেকেই নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রচেষ্টা না করে, আর কেবল প্রতীকী উপস্থিতিতেই বিষয়টা সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে সেই সংস্থার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা একেবারেই যুক্তিসঙ্গত।

সামাজিক ক্ষেত্রগুলিকে অবশ্যই মানুষের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে, পরিবর্তনের সহ-স্রষ্টা হিসেবে কাজ করতে হবে। | ছবি সৌজন্যে : সাদা কোহলি দাভে

3. কে প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করছেন?

অনেক সময় সংস্থাগুলি বাস্তব পরিস্থিতি আর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বোঝার জন্য সম্প্রদায়গুলির সঙ্গে কাজ না করে, আগে থেকে ঠিক করে রাখা সমাধান নিয়ে হাজির হয়। এতে প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি মানুষ ও সম্প্রদায়গুলিকে সরকার বা অলাভজনক সংস্থার “প্রদত্ত” পরিষেবার নিস্ক্রিয় গ্রহণকারী হিসেবে দেখছি, নাকি নিজেদের উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকা সক্রিয় অধিকারভোগী হিসেবেই তাঁদের স্বীকৃতি দিচ্ছি? যে সমাধানগুলি মানুষের জন্য তৈরি হয় কিন্তু মানুষকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ভাবনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে না, সেগুলি কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

একটি অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এটা স্বীকার করে যে সমতা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এখানে বিষয়টা সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষদের দ্বারা প্রান্তিকদের হয়ে ‘গলা ফাটানো’-কে বোঝায় না; বরং সেই কাঠামোগুলি ভেঙে ফেলাকে বোঝায়, যেগুলি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠরোধ করে। এর মানে হলো ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্পের চেয়ে জোর দেওয়া—সওয়াল-জবাব, সম্পদের ন্যায্য পুনর্বণ্টন, অন্তর্ভুক্তি আর অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থাগত পরিবর্তনের ওপর। প্রকৃত পরিবর্তন আসলে লুকিয়ে আছে দৈনন্দিন চর্চার মধ্যেই—কে সিদ্ধান্ত নেবে, কে কথা বলবে, কার হাতে ক্ষমতা থাকবে, আর কার বাস্তব অভিজ্ঞতা ঠিক করবে কোন বিষয়গুলি অগ্রাধিকার পাবে।

কোনো সংস্থা কি তারা শুরুতে যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কথা ভেবেছিল, সেটিকে প্রয়োজনে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে রাজি আছে? এর জন্য দরকার সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সম্মান করা এবং তাদেরকেই কাজের কেন্দ্রে রাখা। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়—একটি সংস্থা ভাবতে পারে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় একটি সম্প্রদায়ের সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সম্প্রদায়ের মানুষ হয়তো মনে করেন, খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যাটাই তাঁদের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি।

গ্রামের প্রান্তিক সম্প্রদায়ের যুবকদের জন্য সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও অধিকার নিয়ে একটি ফেলোশিপ আয়োজন করতে গিয়ে আমরা এই বিষয়টা সম্পর্কে নিজেরাই হাতে–কলমে শিখেছি। তা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে, তরুণরা আমাদের বারবার একটাই কথা বলেছেন: “আমরা আসলে যা চাই, তা হলো ভালো মানের শিক্ষা ব্যবস্থা আর সেই সমস্ত সুযোগ, যেগুলি আপনারা পেয়েছেন।” শেষ পর্যন্ত আমরা বুঝেছি, শুধু শেখানো নয়—শোনাও জরুরি। তাই আমরা আমাদের কাজের পরিবর্তন করি, যেন তা সত্যিই তাঁদের কথার প্রতিফলন করে। এই নতুন উদ্যোগগুলির নেতৃত্ব দিয়েছিল সেই তরুণরাই, যাঁরা পরে নিজেরাই এই সুযোগগুলি কাজে লাগাতে পেরেছে।

4. আপনি কি কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলছেন?

অধিকারভিত্তিক সংস্থাগুলির তহবিল প্রদানকারী সংস্থা মারিওয়ালা হেলথ ইনিশিয়েটিভ–এর ফিলান্থ্রপি ডিরেক্টর রাজ মারিওয়ালা বলেন, “প্রায়শই, ফলাফল সংখ্যায় পরিমাপ করা হয়—যেগুলি সহজে দেখা যায়, মাপা যায়। অধিকার-ভিত্তিক কাজ কেবল ওপর ওপর করা ত্রাণকার্য নয়, বরং এটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে। এটি বৈষম্যের মূলে থাকা কাঠামোগত বাধাগুলিকেই চ্যালেঞ্জ করে। অধিকারভিত্তিক কাজের অর্থায়ন মানেই ন্যায়বিচারের জন্য অর্থায়ন। আমাদের এমন একটি বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলতে সংস্থাগুলিকে সহায়তা করা উচিত, যেখানে শিক্ষা, জীবিকা, স্বাস্থ্য বা হিংসা থেকে মুক্তির মতো মৌলিক মানবাধিকারগুলিকে কোনো বিশেষাধিকার হিসেবে নয়, বরং সবার জন্য নিশ্চিত অধিকার হিসেবে দেখা হয়। আমরা যেসব বিষয় নিয়ে কাজ করি, সেগুলি কোনো বিচ্ছিন্ন ‘সমস্যা’ নয়—এগুলি আসলে একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার লক্ষণ।”

একটি অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দায়বদ্ধতার দাবি করে, বৈষম্যের শিকড়ে আঘাত হানে, সম্পদের ন্যায্য পুনর্বণ্টনের কথা বলে, এবং মানুষের নিজস্ব ক্ষমতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণকে কেন্দ্রস্থলে স্থাপনের দাবি করে। এর ভিত্তি আমাদের সংবিধান, যেখানে ন্যায়বিচারকে অনুগ্রহ হিসেবে নয়, নিশ্চিত অধিকার হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আজ যখন বৈষম্য আরও বাড়ছে, তখন সামাজিক খাতের কাজ হওয়া উচিত মানুষের সঙ্গে সংহতিতে দাঁড়িয়ে, তাদেরকে পরিবর্তনের সমান সহ-স্রষ্টা হিসেবে দেখা। এর চেয়ে কম কিছু করলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস আরও দৃঢ় হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করে।

এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI

আরও জানুন

  • উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিকার-ভিত্তিক পদ্ধতির একটি বিশ্বব্যাপী নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পড়ুন।
  • জানুন কীভাবে সংবিধানের ভাষাকে প্রান্তিক সাম্প্রদায়ের কাছে আরও সহজলভ্য করা যায়।
  • অধিকারকে কেন্দ্রস্থলে স্থাপন ব্যতিরেকে জনকল্যাণমূলক ভাবনার ফলাফল সম্পর্কে জানতে এই সাক্ষাৎকারটি পড়ুন।
donate banner
We want IDR to be as much yours as it is ours. Tell us what you want to read.
ABOUT THE AUTHORS
মহম্মদ নওয়াজউদ্দিন-Image
মহম্মদ নওয়াজউদ্দিন

মহম্মদ নওয়াজউদ্দিন মারিওয়ালা হেলথ ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যুক্ত। এর আগে তিনি স্কুল ফর ডেমোক্রেসিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা ক্ষেত্রে কাজ করেছেন, যেখানে তিনি তরুণদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং পাঠ্যক্রম উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষা ও সুযোগের ক্ষেত্রে সবার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থেকেই নওয়াজউদ্দিন ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী একসঙ্গে অবসর কালেক্টিভ প্রতিষ্ঠা করেন।

সাবা কোহলি দাভে

সাবা কোহলি দাভে অবসর কালেক্টিভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। অবসর কালেক্টিভ একটি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ, যা গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার তরুণদের সঙ্গে কাজ করে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো তরুণদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা, তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তোলা এবং এমন সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে সহায়তা করে। এর আগে সাবা IDR, সোশ্যাল ওয়ার্ক অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, বেয়ারফুট কলেজ, এবং স্কুল ফর ডেমোক্রেসির সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি লাইব্রেরি গড়ে তোলা এবং গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ নিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরি করা। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজে এডুকেশন, গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে এমফিল করছেন।

COMMENTS
READ NEXT