ভারতে মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের কর্মজীবনে যৌন হেনস্থা প্রায়শই একটি স্বাভাবিক ও নিত্যদিনের ঘটনা হিসেবে মনে করা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে, এই হয়রানি শুরু হয় আবাসন এলাকায় প্রবেশের গেট থেকেই—যেখানে পুরুষ নিরাপত্তারক্ষী, মালি বা গাড়ি পরিষ্কার করেন যারা তাঁরা যৌন সুবিধার বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। এমন কি এই নির্যাতনের ঘটনা নিয়োগকর্তার বাড়িতেও চলতে থাকে, যেখানে নানা রকমের যৌন শোষণ ও মানসিক চাপের ঘটনার কথা জানা যায়। জাত, ধর্ম এবং দারিদ্র্যের কারণে সমাজে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা এইসব কর্মীরা প্রতিবাদ করতে পারেন না। অবিশ্বাস, প্রতিশোধ, সামাজিক কলঙ্ক বা জীবিকা হারানোর ভয়ে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা পরিবার বা সহকর্মীদের কাছেও প্রকাশ করতে সাহস পান না। নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে ক্ষমতার তীব্র অসমতার কারণে কর্মীরা নিজের অভিযোগের কথা জানাতেও পারেন না। কারণ অভিযোগ তুললেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অস্বীকার করা হয়, মিথ্যা বলার দোষ চাপানো হয়, এমনকি সরাসরি কাজ থেকে বরখাস্তও করা হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে, কারণ এই ধরনের অভিযোগ জানানোর আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনও খুবই অপ্রতুল।
কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হয় রানি (প্রতিরোধ, নিষিদ্ধকরণ, সমাধান) আইন 2013, অথবা POSH আইনই হলো মহিলা পরিচারিকাদের জন্য কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিযোগ জানানো এবং সমাধানের একমাত্র আইনি সাহায্যের পথ। যদিও, আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আইনের ধারা 6(1) অনুযায়ী, মহিলাদের পুলিশে যৌন হয়রানির অভিযোগ দায়ের করার জন্য প্রতিটি জেলায় স্থানীয় কমিটি (LC) গঠন করার কথা বলা হয়েছে, যাতে নারীরা যৌন হয়রানির অভিযোগ পুলিশে জানাতে সহায়তা পান। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে করা হয়নি।
2017 সালে মার্থা ফ্যারেল ফাউন্ডেশন (MFF), লিঙ্গভিত্তিক হেনস্থা প্রতিরোধে কর্মরত এক অলাভজনক সংস্থা, কর্তৃক ফাইল করা এক RTI থেকে জানা যায় যে 655টি জেলার মধ্যে মাত্র 191টিতে স্থানীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
যদিও, এই স্থানীয় কমিটিগুলি মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের কাছে উপলব্ধ কিনা তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। 2023 সালের একটি স্টাডি থেকে এই ব্যাপারে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। এই স্টাডি থেকে জানা যায় যে 817 জন মহিলা কর্মীদের মধ্যে 96% মহিলার মতেই তাঁদের জেলার স্থানীয় কমিটিতে যোগাযোগ করা অত্যন্ত দুষ্কর ছিল। কেউ কেউ জানিয়েছিলেন যে অফিসের অবস্থান সম্পর্কে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না, কেউ কেউ আবার জানান দূরত্বের কারণে তাঁরা সেখানে যেতে পারেন নি।
রাজধানী অঞ্চলের অধিকাংশ গৃহ পরিচারিকারাই পরিযায়ী তাই এখানে তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং সহায়ক নেটওয়ার্কের অভাব রয়েছে। এনারা প্রধানত ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহার থেকে এখানে কাজে আসেন। এই সমস্ত সমস্যাগুলি স্থানীয় কমিটিগুলির সহজলভ্যতাকে আরো দুষ্কর করে তোলে।

কর্মী অধিকার = কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা
আমাদের এটা বুঝতে হবে যে মহিলা গৃহ পরিচারিকারা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের তুলনায় মূলত তাঁদের কাজের ধরণ এবং কর্মক্ষেত্রের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের প্রায়শই বাথরুম ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না, তাঁরা পানীয় জল গ্রহণের সুবিধা পান না, চেয়ারে বসার অধিকার তাঁদের নেই, অনেক সময় ন্যায্য এবং নিয়মিত বেতনও পান না, ফলে তাঁরা মৌলিক মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক স্বাধীনতার সুবিধাটুকু থেকেও বঞ্চিত হন। এই প্রক্রিয়ায় তাঁদের আত্মমর্যাদা ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায়, যা নির্যাতনের সুযোগ আরও বাড়িয়ে তোলে। একই সঙ্গে এতে নিয়োগকর্তার ক্ষমতা আরও দৃঢ় হয় এবং শোষণের এই চক্রটি অব্যাহত থাকে।
ক্রমশ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ায় মহিলা গৃহ পরিচারিকারা ন্যায্য মজুরি, ছুটি বা উন্নত কর্মপরিবেশের দাবি তুলতে ভয় পান। MFF-এ কাজ করতে গিয়ে গৃহ পরিচারিকাদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা এমন ঘটনার সম্পর্কে জানতে পেরেছি, যেখানে নয় বছর কাজ করার পর কারও বেতন বেড়েছে মাত্র 80০ টাকা। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কর্মীদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সরাসরি নিয়োগকর্তার যৌন দাবির সঙ্গে শর্তসাপেক্ষ।
উপরন্তু, তাঁরা যেহেতু কারোর বাড়িতে কাজ করেন ফলে অনেক সময় তাঁদের উপর নজরদারি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর ফলে নিয়োগকর্তার হাতে সমস্ত ক্ষমতা চলে যায়। এছাড়াও গৃহকর্মকে এখনো কোনো বিশেষ দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না; বরং একে মহিলাদের তথাকথিত ‘সাধারণ’ গৃহস্থালির দায়িত্ব হিসেবেই মনে করা হয়। এই মানসিকতার কারণেই অনেকে মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের একজন কর্মী বলে মনে করেন না। এই দৃষ্টিভঙ্গিই বেতনের বৈষম্যের জন্য দায়ী। উদাহরণস্বরূপ, একজন পুরুষ রাঁধুনিকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গণ্য করা হয়, অথচ একই কাজ যখন একজন মহিলা করেন তখন মনে করা হয় মহিলাটি তাঁর স্বভাবজাত কাজই করছেন।
আর পাঁচটা সাধারণ আনুষ্ঠানিক কাজের মতো গৃহ পরিচারিকাদের কাজকে মান্যতা দেওয়া হয় না এবং তাঁদের কাজের জন্য সেই অর্থে কোনো নিয়ম-কানুন নেই, এই ধরণের সম্মিলিত ব্যর্থতাই মহিলাদের জন্য এই কাজকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
শ্রম অধিকার–সংক্রান্ত গৃহ পরিচারিকাদের ফোরামগুলিতে সাধারণত ন্যায্য মজুরি, ছুটি, গ্র্যাচুইটি এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। কিন্তু যৌন হয়রানির মতো বিষয়টি সেখানে প্রায়শই উপেক্ষিত হয়ে থাকে। একইভাবে, আমরা যখন MFF –এ গৃহকর্মীদের সঙ্গে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলা শুরু করি, তখন দেখি—এটি তাঁদের কাছে প্রায় কোনো সমস্যাই নয় এবং তাঁরা এই ধরণের হয়রানিকে অনেকাংশে স্বাভাবিক বলেই মনে করেন। এর পেছনে কাজ হারানোর ভয়, সামাজিক লজ্জা, আর এই বিষয়ে অজ্ঞতা কাজ করে—যার ফলে তাঁরা বুঝতেই পারেন না যে যৌন হয়রানি তাঁদের কর্মস্থলে আরও বেশি অবদমন করে।
যদিও, পারস্পরিক সংহতি ও সহায়তার মাধ্যমে মহিলারা বুঝতে পেরেছেন যে যৌন হয়রানির প্রতি তাঁদের এই অসহায়তা তাঁদের নৈতিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস কেড়ে নেয়, যার ফলে তাঁরা নিজেদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার দাবি করতে পারেন না।
গবেষণা ও আলোচনার মাধ্যমে সচেতনতা গড়ে তোলা
2021 সালের মে মাসে, UN ট্রাস্ট ফান্ডের সহায়তায় MFF দিল্লি, ফরিদাবাদ ও গুরগাঁওয়ে একটি প্রকল্প শুরু করে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের POSH আইনের অধীনে তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা। একদিকে এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাগুলিতে মহিলারা যাতে সহজে পৌঁছে যেতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা, আর অন্যদিকে স্থানীয় কমিটি (LC), নোডাল অফিসার ও পুলিশ কর্মীদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীদের ক্ষমতা জোরদার করা, যাতে তাঁরা যৌন হয়রানির অভিযোগগুলি আরও সংবেদনশীল ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেন।
মহিলা গৃহ পরিচারিকারা জানিয়েছেন, পুরুষ নিয়োগকর্তারা অবাঞ্ছিতভাবে তাঁদের শরীর স্পর্শ করেন অথবা অন্যায্য অনুরোধের মাধ্যমে তাঁদের অস্বস্তিতে ফেলেন।
এই প্রকল্পটি কমিউনিটি–ভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক গবেষণার নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছিল। এটি এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করা, বিশ্লেষণ করা এবং সমাধান খোঁজার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মহিলা গৃহ পরিচারিকারা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটির হাল নিজেদের হাতে নিতে এবং নিজেদের সমাধানের পথ নিজেরাই তৈরি করতে পারেন। প্রকল্পটি 2024 সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত চলে। এই সময়ে আমরা মহিলা গৃহ পরিচারিকা, স্থানীয় কমিটির সদস্য এবং তাঁদের সঙ্গে কাজ করা অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বহু পরামর্শ সভা ও কর্মশালার আয়োজন করেছি। এর উদ্দেশ্য ছিল সমস্যাটিকে আরও গভীরভাবে বোঝা এবং সম্মিলিতভাবে কার্যকর সমাধান তৈরি করা।
প্রকল্পের শুরুতে মহিলা গৃহ পরিচারিকারাই 1,939 জন সহকর্মীর মধ্যে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেন, যাতে যৌন হয়রানি আইনত অপরাধ কি না—সেই সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে কতটা সচেতনতা রয়েছে তা বোঝা যায়। দেখা যায়, মাত্র 16 শতাংশ মহিলা স্বীকার করেন যে এটি একটি আইনগত অপরাধ। তবে এই নিয়ে কথা বলতে তাঁরা অস্বস্তি বোধ করছিলেন, কারণ বিষয়টি তাঁদের মধ্যে লজ্জা, রাগ এবং হয়রানি ঠেকাতে না পারার হতাশা জাগিয়ে তুলছিল। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন—“এই কথা কেন তুলছেন?” “এভাবেই তো সব চলে আসে; কিছুই বদলানো যায় না।”
যৌন হিংসা একটি নিষিদ্ধ বিষয়, যা নিয়ে খুব কমই আলোচনাকরা হয়। তাই যখন কেউ তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন তখন যেন তাঁরা নিরাপদ বোধ করেন এবং তাঁদের সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
সমবায় গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রাধান কৌশল ছিল একাধিক লিসেনিং অ্যান্ড লার্নিং সার্কেল সংগঠিত করা। এর মাধ্যমে সমস্যাটিকে ঘিরে বিশ্বাস ও পারস্পরিক সংহতির অনুভূতি তৈরি হয়। নিরাপদ পরিবেশে মহিলারা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা খুলে বলতে উৎসাহ পান এবং একে অপরকে একটি সহায়ক গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি বিভিন্ন অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি ও উপকরণের মাধ্যমে আলোচনা করা হয়, যার মধ্যে পার্টিসিপেটরি সেফটি অডিট অন্যতম। এই কার্যক্রমে, মহিলারা নিজেদের এলাকা ও যাতায়াতের পথের মানচিত্র তৈরি করেন এবং তাঁদের কর্মক্ষেত্রের আশপাশের নিরাপদ ও অনিরাপদ স্থানগুলি চিহ্নিত করেন। আলোচনার সময় তাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তাঁরা জানান, কাজের জায়গায় ও কাজের বাইরে কিছু মানুষ ও পরিস্থিতি তাঁদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিছু মহিলা জানিয়েছেন, পুরুষ নিয়োগকর্তারা অযাচিতভাবে তাঁদের শরীর স্পর্শ করেন বা অনুপযুক্ত কথা বলেন, এতে তাঁরা খুব অস্বস্তি বোধ করেন। আবার কেউ কেউ যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের হুমকির কথাও জানান। কিছু মহিলা জানিয়েছেন যে তাঁরা নিয়োগকর্তাদের কিশোর ছেলেদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। আবার কেউ কেউ মহিলা নিয়োগকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত প্রশ্ন বা অনুপযুক্ত আচরণেও অস্বস্তি অনুভব করেছেন।
একাধিক লিসেনিং অ্যান্ড লার্নিং সার্কেলে অংশ নিয়ে মহিলারা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেন যে, কাজের জায়গায় বা কাজে যাতায়াতের পথে তাঁরা যেসব আচরণের শিকার হয়েছেন, সেগুলো মোটেই স্বাভাবিক নয়। তাঁরা বুঝতে পারেন, এগুলি আসলে যৌন হয়রানি। এগুলি তাঁদের নিরাপদে কাজ করার অধিকার এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচার মৌলিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে এই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে জবাবদিহিও চাইতে শুরু করেন। কারণ যেসব ব্যবস্থা তাঁদের সহায়তার জন্য তৈরি করা হয়েছে, সেগুলি অনেক সময়ই সঠিকভাবে কাজ করে না, সহজে পৌঁছানো যায় না, অথবা এতটাই ভয় সৃষ্টি করে যে সেগুলি ব্যবহার করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
সচেতনতা থেকে পদক্ষেপ: একটি রূপরেখা
এই বাধাগুলির মুখে পড়ে মহিলারা তাঁদের সুরক্ষার জন্য তৈরি ব্যবস্থাগুলিকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেন। একটি সেশনে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন— “আইন জেনেই বা কী হবে? আমাদের জেলার ম্যাজিস্ট্রেটই (DM) দায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় কমিটি (LC) গঠন করেন না, তাহলে আমরা অভিযোগ জানাব কীভাবে?”
অংশগ্রহণমূলক গবেষণা পদ্ধতি নিশ্চিত করেছে যে মহিলারা নিজেরাই সমস্যা থেকে সমাধানের পথ তৈরি করেছেন। তাঁরা কীভাবে এটি করেছেন তা সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো।
1. কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাওয়া
বেশ কিছু মহিলা গৃহ পরিচারিকা স্থানীয় কমিটি (LC) কেন গঠন করা হয়নি—তা জানতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। এরপর মহিলা গৃহ পরিচারিকারা MFF-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে দিল্লির বিভিন্ন জেলায় যান এবং অন্যান্য মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের তাঁদের সঙ্গে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান।
একটি আবাসন সমিতির বাসিন্দা, কর্মী এবং মহিলা গৃহ পরিচারিকারা যৌন হয়রানি কীভাবে প্রতিরোধ করা যায় এবং অভিযোগ করলে কীভাবে ন্যায্য ও কার্যকর সমাধান পাওয়া যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
মহিলা নেত্রীরা, যাদের পহেলকার বলা হয়, এই উদ্যোগে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি ও মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। পহেলকাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্য মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের POSH আইন সম্পর্কে সহজ ভাষায় বোঝান। তাঁরা মহিলাদের ডিমান্ড কার্ডে সই করতে উৎসাহিত করেন। এই ডিমান্ড কার্ডের মাধ্যমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে— তাঁদের জেলায় স্থানীয় কমিটি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। যদি স্থানীয় কমিটি না থাকে, তাহলে দ্রুত তা গঠনের দাবি জানানো হয়। প্রায় 3,000 মহিলা গৃহ পরিচারিকা এই কার্ডে সই করেন। পরে দিল্লি ও হরিয়ানার যেসব এলাকায় প্রকল্পটি চলছিল, সেসব জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে কার্ডগুলি জমা দেওয়া হয়।
গুরুগ্রামে মহিলা গৃহ পরিচারিকারা ডিমান্ড কার্ড জমা দিয়ে নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শুরু করার পরেই জেলা প্রশাসন পরামর্শ দেয় যে, MFF যেন আবাসন সমিতিগুলির মধ্যে POSH আইন নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনগুলির (RWAs) সঙ্গে কাজ করে। এর ফলে এই প্রথমবার গুরুগ্রামের একটি আবাসন সমিতিতে বাসিন্দা, কর্মী এবং মহিলা গৃহ পরিচারিকারা একসঙ্গে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ করলে কীভাবে সঠিকভাবে এর সমাধান পাওয়া যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
2023 সালে MFF দিল্লির সমস্ত 11টি জেলায় আরটিআই দায়ের করে। এর উদ্দেশ্য ছিল—স্থানীয় কমিটিগুলি ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা জানা এবং সরকারি তথ্য দিয়ে দাবি আরও জোরালো করা। পরে এই তথ্যগুলি সহজ ভাষায় মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। কমিউনিটি বৈঠক, ব্যানার এবং বুকলেটের মাধ্যমে এসব কথা জানানো হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লির মহিলা গৃহ পরিচারিকারা LC সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁরা আলোচনা করেন—POSH আইন কীভাবে তাঁদের জন্য আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারে।
2. নিয়োগকর্তাদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা
নিজেদের দাবি জানানোর পাশাপাশি মহিলা গৃহ পরিচারিকারা তাঁদের নিয়োগকর্তাদের সঙ্গেও সচেতনতা অভিযান চালান। এই অভিযানে মর্যাদা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করার মতো নির্দিষ্ট আইন না থাকায়, মহিলারা নিয়োগকর্তাদের কাছে তাঁদের মৌলিক অধিকারগুলো সম্মান করার দাবি জানিয়েছেন।এই উদ্দেশ্যে তাঁরা একটি চার্টার অব ডিমান্ডস তৈরি করেন এবং আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবসে তা নিয়োগকর্তাদের হাতে তুলে দেন। হিন্দি ও ইংরেজি—দুই ভাষায় লেখা এই সনদে প্রতিটি দাবিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং গৃহকর্মের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সমতার অধিকার বলতে বোঝানো হয়—গৃহ পরিচারিকাদের মেঝেতে বসতে বাধ্য করা বা তাঁদের জন্য আলাদা পাত্রে খাবার দেওয়ার মতো প্রথার অবসান। কিছু নিয়োগকর্তা এই ডিমান্ড কার্ড সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেও, অনেকেই তা গ্রহণ করেন।
এখন বিভিন্ন এলাকায় মহিলা গৃহ পরিচারিকারা একসঙ্গে সংগঠিত হচ্ছেন। তাঁরা একে অপরকে সাহায্য করছেন এবং বেতন নিয়ে সমস্যা, বৈষম্য ও হয়রানির ঘটনায় একে অন্যের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। একটি ঘটনায়, দিল্লির জসোলা বিহার এলাকায় প্রায় 30 জন মহিলা গৃহ পরিচারিকা একত্রিত হন। তাঁরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন এবং এক অত্যাচারী নিয়োগকর্তার কাছ থেকে দু’জন মহিলা গৃহ পরিচারিকাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। ওই নিয়োগকর্তা ওই দুই মহিলাকে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ঠিকমতো খাবার ও জল না দিয়ে কাজ করতে বাধ্য করেছিলেন। সবাই এক জোট হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব পায় এবং মহিলারা সাহায্যের হাত পান।
3. অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর পূরণ
একাধিক আঞ্চলিক ও রাজ্যস্তরের পরামর্শসভায় মহিলা গৃহ পরিচারিকারা নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে POSH আইন পর্যালোচনা করেন এবং কোন কোন ঘাটতির কারণে এই আইন তাঁদের কাছে কার্যত অপ্রাপ্য হয়ে উঠছে—তা বিশ্লেষণ করেন। নিচে তাদের কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হলো:
- জেলা আধিকারিকের (DO) দায়িত্ব হওয়া উচিত—প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে নির্ধারিত নোডাল অফিসার নিয়োগ করা, যার কাছে যৌন হয়রানির অভিযোগ জানাতে ইচ্ছুক যেকোনো মহিলা গৃহ পরিচারিকা সহজেই পৌঁছে যেতে পারেন এবং তাঁদের স্থানীয় কমিটি (LC)-এর কাছে অভিযোগ দায়ের করতে সাহায্য করবেন।
- জেলা আধিকারিকের (DO) নিয়মিতভাবে যৌন হয়রানি এবং যৌন হয়রানির অভিযোগ কীভাবে জানাতে ও সমাধান পেতে হয়, সে বিষয়ে সচেতনতা অভিযান চালানো উচিত। এই সচেতনতা কার্যক্রম মহিলা গৃহ পরিচারিকা ও নিয়োগকর্তা—উভয়ের জন্যই প্রয়োজন। এই প্রচার নানাভাবে করা যেতে পারে। যেমন, পথনাটিকার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে বার্তা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের দেয়ালে ছবি এঁকে বিষয়গুলি সহজভাবে বোঝানো যেতে পারে। পাশাপাশি ওয়ান-স্টপ সেন্টার, বাস স্টপ, মেট্রো স্টেশন এবং অন্যান্য জনসমাগমপূর্ণ স্থানে পোস্টার লাগিয়ে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
- জেলা আধিকারিকদের উচিত স্থানীয় কমিটির সদস্য ও নোডাল অফিসারদের নাম, যোগাযোগের নম্বর এবং কক্ষ নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে প্রদর্শন করা। যেমন—জেলা কার্যালয়, বাস স্টপ, মেট্রো স্টেশন ইত্যাদি স্থানে এবং জেলার ওয়েবসাইটেও। এসব তথ্য একাধিক ভাষায় দেওয়া উচিত, যাতে সবাই সহজে বুঝতে ও ব্যবহার করতে পারেন।
- মহিলা হেল্পলাইন নম্বর যেমন 181 এবং 1091-তে সবসময় POSH আইনের অধীনে জেলা আধিকারিক এবং স্থানীয় কমিটির সম্পর্কে তথ্য উপলব্ধ থাকতে হবে।
- সুপ্রিম কোর্টের ইনিশিয়েটিভস ফর ইনক্লুশন ফাউন্ডেশন বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (2023) মামলার নির্দেশ অনুযায়ী, জেলা আধিকারিক, স্থানীয় কমিটি এবং নোডাল অফিসারদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। এই প্রশিক্ষণে POSH আইনের অধীনে তাঁদের কী কী দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তা সহজভাবে বোঝানো প্রয়োজন। এতে করে তাঁরা আইনটি সঠিকভাবে কার্যকর করতে এবং অভিযোগের সঠিক সমাধান দিতে সক্ষম হবেন।
- স্থানীয় কমিটির একজন এক্স-অফিসিও সদস্যকে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত এগোবে এবং সময়মতো শেষ করা সম্ভব হবে।
কাঠামোগত বাধা এখনো রয়ে গেছে
মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের সংগঠিত করা, তাঁদের একসঙ্গে সক্রিয় করা এবং স্থানীয় কমিটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও কিছু সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে, যেগুলো পুরোপুরি সমাধান করা যায়নি।
প্রোটোকলের অভাব: স্থানীয় কমিটির সদস্যরা স্থায়ী কর্মচারী নন। তাই তাঁরা সব সময় জেলা আধিকারিকের দপ্তরে উপস্থিত থাকেন না। এর ফলে অভিযোগ জানাতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। এছাড়া জেলা আধিকারিকের দপ্তরে অভিযোগ নেওয়ার জন্য যদি স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকে, তাহলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। অভিযোগ জানানোর পরিষ্কার পদ্ধতি না থাকলে অনেক সময় তা সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছায় না। এর কারণে ন্যায়বিচার পেতে দেরি হয়।
লজিস্টিক সমস্যা: যাতায়াত–সংক্রান্ত বাধা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা আধিকারিকের দপ্তরে যেতে গিয়ে যাতায়াতের খরচ হয় এবং কাজের সময় নষ্ট হয়। এই দু’টি কারণেই অনেক মহিলা গৃহ পরিচারিকা অভিযোগ দায়ের করতে আগ্রহ হারান। কারণ এতে তাঁদের দৈনিক মজুরি হারানোর ঝুঁকি থাকে।
অভিযোগ নিষ্পত্তি নিয়ে উদ্বেগ: অনেক সময় স্থানীয় কমিটি অভিযোগগুলি ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, 2023 –এর ধারা 79 অনুযায়ী পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু এতে প্রায়ই POSH আইনে নির্ধারিত 90 দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যায়। এর ফলে অভিযোগের সমাধান আরও দেরি হয়। এ ছাড়া মহিলা গৃহ পরিচারিকারা পুলিশে অভিযোগ করতে গিয়ে গোপনীয়তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে বা তা নিরাপদ থাকবে কি না—এই বিষয়গুলো তাঁদের কাছে স্পষ্ট নয়।
এ ছাড়াও, স্থানীয় কমিটিগুলি অভিযোগ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। দিল্লিতে তাঁরা প্রায়শই অফিসের জায়গার অভাব অনুভব করেন। অনেক সময় ভাতা পেতে দেরি হয় এবং POSH আইন নিয়ে যথেষ্ট প্রশিক্ষণও থাকে না। এই সব সমস্যার কারণে স্থানীয় কমিটিগুলির পক্ষে মহিলা গৃহ পরিচারিকাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। ফলে মহিলারা ন্যায়বিচার পেতে আরও বেশি সমস্যার সম্মুখীন হন।
যা শুরু হয়েছিল কেবলামাত্র যৌন হয়রানি সম্পর্কিত একটি সাধারণ আলোচনা দিয়ে, তা এখন অনেক বড় আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে মহিলারা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সম্মান, ন্যায্য কাজের পরিবেশ এবং একজন শ্রমিক হিসেবে নিজেদের অধিকার দাবি করছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যদি আইনটি সঠিকভাবে কার্যকর না করে, সচেতনতা না বাড়ায় এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা সহজ না করে, তাহলে POSH আইন শুধুমাত্র একটা লিখিত আইন হয়েই থেকে যাবে। এতে অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলাদের জীবনে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসবে না।
এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI।
—
আরও জানুন
- ভারতের শ্রম কোডগুলি অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষের জন্য বাস্তবে কতটা কাজে আসে—তা বোঝার জন্য এই নিবন্ধটি পড়তে পারেন।
- অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যৌন হয়রানির পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে UN উইমেন–এর এই প্রতিবেদনটি পড়া যেতে পারে।
- এছাড়া গৃহকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যে নানা সমস্যা ও বাধার মুখে পড়তে হয়, সেগুলি বুঝতে এই বিষয়ক প্রবন্ধটি পড়লে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।






