ছত্তিশগড়ের রায়গড় জেলায় সাধারণ মানুষজন নিজেদের উদ্যোগে একটি কয়লা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং কর্পোরেট খননের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।

Read article in Hindi
8 min read

2008 সালের 5 জানুয়ারি ছত্তিশগড়ের রায়গড় জেলার খামারিয়া গ্রাম এবং তার আশেপাশের গ্রামের মানুষজন একটি জনশুনানিতে জড়ো হয়েছিলেন। এই জনশুনানির উদ্দেশ্য ছিল জিন্দাল স্টিল অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের Gare IV/6 খনি প্রকল্পটি স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা। কিন্তু এই জনশুনানিটি তড়িঘড়ি করে আয়োজন করা হয়েছিল। এমনকি সময় পরিবর্তন হলেও পঞ্চায়েতগুলিকে তা জানানো হয়নি। অথচ এই গ্রামগুলি তামনার ব্লকে অবস্থিত, যা পঞ্চম তফসিলভুক্ত এলাকা (এখানে মূলত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস)। এই এলাকা পঞ্চায়েত (তফশিলি অঞ্চলের সম্প্রসারণ) বা 1996 সালের PESA, আইন দ্বারা সুরক্ষিত। PESA আইন অনুযায়ী, এই ধরনের জনশুনানির আগে পঞ্চায়েতকে জানানো বাধ্যতামূলক

এই গ্রামবাসীদের অনেকেই একটি সম্প্রদায়-ভিত্তিক সংগঠন (জনগণের সংগঠন) ‘জন চেতনার’ অংশ ছিলেন, যাদের সাথে আমিও কাজ করি। আমরা খনন প্রকল্পের জন্য দেওয়া পরিবেশগত ছাড়পত্রের বৈধতা নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এরপর আমাদের লোকজনও প্রতিরোধ করে এবং সংঘর্ষ শুরু হয়। এই সংঘর্ষে কমপক্ষে 50 জন গ্রামবাসী আহত হন এবং আরও অনেককে গ্রেফতারও করা হয়। পাশের গ্রামের মানুষজন এই ঘটনার কথা জানতে পারেন। কর্তৃপক্ষের দমন-পীড়ন যত বাড়তে থাকে, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের ইচ্ছাও ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

2008 সালে গ্রামবাসীরা যে ভয়াবহ হিংসাত্মক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে আমাদের আন্দোলন হবে সম্পূর্ণ অহিংস পদ্ধতিতে। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, যদি আমরা শারীরিকভাবে পাল্টা প্রতিরোধ করতে যাই, তাহলে প্রশাসন আমাদের জনগণের নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরার এবং আমাদের প্রতিরোধ দমন করার সুযোগ পেয়ে যাবে। একটি বৈঠকে আমরা এম. কে. গান্ধীর বিখ্যাত লবণ সত্যাগ্রহ, তাঁর অসহযোগ আন্দোলনের নীতি এবং আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু করি। গান্ধী দেশের সমুদ্রতীরের লবণকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে—নিজ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকার আসলে সেই দেশের জনগণেরই থাকা উচিত। আমাদের ক্ষেত্রে আমরা শুরু করলাম কয়লা সত্যাগ্রহ। 2011 সালের 2 অক্টোবর, গান্ধীর জন্মবার্ষিকীতে, আমরা সিদ্ধান্ত নিই—যদি আমাদের একটি কয়লা-নির্ভর অর্থনীতিতে বসবাস করতে বাধ্যই করা হয়, তাহলে আমাদের নিজেদেরই কয়লা তোলা এবং সেই কয়লা বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা উচিত। সেই সাথে এটাও আমাদের নিশ্চিত করা উচিত যে সেই লাভ যেন গ্রামের মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়।

What is IDR Answers Page Banner

আমরা গারে গ্রাম থেকে মিছিল করে কেলো নদীর দিকে এগিয়ে যাই। এই নদীর তলদেশে কয়লার সমৃদ্ধ স্তর রয়েছে—অর্থাৎ নদীর বালুমাটির নিচে প্রচুর কয়লা পাওয়া যায়। সেখানে আমরা মাটি খুঁড়ে কয়লা তুলতে শুরু করি এবং প্রায় 3 টন কয়লা সংগ্রহ করে তা গ্রামে নিয়ে আসি। এরপরের কাজ ছিল একজন ক্রেতা খুঁজে বের করা। আমাদের দলের অনেকেই ইটভাটা এবং ধাবাতে কাজ করতেন। ফলে এইসব জায়গার মালিকদের সঙ্গে তাঁদের পরিচিতি ও যোগাযোগ ছিল, তাই আমরা সেই পরিচিত নেটওয়ার্ককেই কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিই। আমরা ইটভাটা ও ধাবার মালিকদের নিলামে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানাই এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাছেই সেই কয়লা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করি।

যদিও, নিজেদের উদ্যোগে কয়লার ব্যবসা দাঁড় করানোই কয়লা সত্যাগ্রহের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, এই আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা একে অপরের কাছ থেকে শিখি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভূমি অধিকার সহ মানুষের বিভিন্ন চাহিদা নিয়ে কাজ করি। পাশাপাশি আমরা কর্পোরেট বা বড় কোম্পানিগুলির কয়লা খননের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-আন্দোলনও নিয়মিত সংগঠিত করি। এছাড়া আমরা এমন একটি মিডিয়া-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যাতে আমাদের এলাকার বাইরের মানুষও এইসব সমস্যার কথা জানতে পারে এবং বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতন হয়।

2023 সালে সত্যাগ্রহ আন্দোলন 12 বছর পূর্ণ করেছে। নতুন বছরে পা রাখার সাথে সাথে, গ্রামীণ ভারতে কর্পোরেট খনন প্রকল্পের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একটি আন্দোলন টিকিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শিক্ষা আমরা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। আমাদের এই লড়াইটি ছত্তিশগড়ে কয়লা খননকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে। তবে আমরা মনে করি, আমাদের কাজের পদ্ধতি দেশের যেকোনো সম্প্রদায়ের জন্য কার্যকর হতে পারে, যারা নিজেদের জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কর্পোরেট দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা:

শিক্ষা

1. মানুষের কাছ থেকে শেখা এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করা

আন্দোলনের শুরুতে খননের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের পাশাপাশি আমরা মূলত মানুষের খাদ্য এবং পেনশনের অধিকার নিয়ে কাজ করতাম । কিন্তু সভায় আমাদের সদস্যরা আমাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমাদের যদি জমিই না থাকে, তাহলে খাদ্য আর পেনশন দিয়ে আমরা কী করব?”। তখন থেকেই আমরা জমির অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করি। আমাদের অনেক সদস্যই ছিলেন ভূমিহীন আদিবাসী। তাই আমরা তাদের জমির দলিলের সাথে সাথে তাদের কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস (সমাজভিত্তিক বনাধিকার) পাওয়ার কাজেও সাহায্য করতে শুরু করি।

যেসব কৃষকের নিজের জমি আছে, কিন্তু খননের কারণে তাঁরা সেই জমি হারিয়েছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোল ইন্ডিয়ার প্রতি একর জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ 5 লক্ষ টাকা এবং সামান্য জমি দেওয়ার কথা। আমাদের এলাকার নেতাদের সাহায্যে আমরা মানুষের অভিযোগ কর্তৃপক্ষের কাছে এবং প্রয়োজনে আদালতেও নিয়ে যেতে শুরু করি।

donate banner

তবে পরে আমরা বুঝতে পারি, ক্ষতিপূরণ কাজে লাগলেও তা প্রতিটি পরিবারের জন্য সর্বোত্তম সমাধান নাও হতে পারে। কারণ এই টাকা দিয়ে মাত্র কিছুদিনই চলা যায়, দীর্ঘদিন নয়। আমাদের গ্রামগুলিতে অনেক বিধবা মহিলা এবং তরুণ-তরুণী ছিলেন, যারা পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যকে হারিয়েছেন। আর্থিক ক্ষতিপূরণের বদলে, কোল ইন্ডিয়ার ক্ষতিপূরণের আরেকটি ব্যবস্থা আছে; যাদের জমি খননের জন্য নেওয়া হয়েছে, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া। আমাদের এলাকার অনেকগুলি আদিবাসী পরিবার আছে, যাদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে রাজি করাতে জন চেতনা সদস্যদের বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। আমরা তাদের বুঝিয়েছি, 5 লক্ষ টাকা একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু সরকারি চাকরি হলে নিয়মিত আয় হবে। আমরা তাদের চাকরির আবেদনপত্র পূরণ করতে সাহায্য করি। দরকার হলে আমরা বেসরকারি ঠিকাদারের মাধ্যমেও কাজ পেতে সাহায্য করি। এই এলাকায় অনেক পরিবারই ভূমিহীন, তাই আমরা কোল ইন্ডিয়ার সঙ্গে কথা বলে মানুষের জন্য ছোট ছোট ব্যবসা বা ক্ষুদ্র উদ্যোগ তৈরির কাজেও সাহায্য করেছি।

আমরা তরুণদের শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিই। তাদের অনেকেই পরে আমাদের সংগঠনে যোগ দেয় বা অন্যভাবে নিজের এলাকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করে। আমরা সব সভা-সমাবেশে সবাইকে বোঝাই যে, শিক্ষার মাধ্যমে তরুণরা যেমন নিজেদের উন্নতি সাধন করবে, তেমনই তাদের নিজেদের সম্প্রদায় এবং সমাজের প্রতিও কিছু দায়বদ্ধতা আছে। 

A group of women marching_coal mine
আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে যদি আমাদের একটি কয়লা-নির্ভর অর্থনীতিতে বসবাস করতে বাধ্যই করা হয়, তাহলে আমাদের নিজেদেরই কয়লা তোলার ব্যবস্থা করা উচিত। | ছবি সৌজন্যে: জন চেতনা

2. বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া

সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত তরুণরা স্মার্টফোনসহ অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ। আমরা বুঝতে পারি, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের মতো করে একটি মিডিয়া ইকোসিস্টেমতৈরি করতে পারি।

আন্দোলনের শুরুতে, অনেক সময় আমরা মূলধারার মিডিয়াকে কোনো ঘটনা জানালে, তারা কিন্তু সেটা একেবারে অন্যভাবে তুলে ধরত। যেমন, “খননের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে 200 জন এসেছিল”—এটা তারা রিপোর্ট করত “খননের পক্ষে সমর্থন জানাতে 200 জন এসেছিল” বলে। তখন আমরা ভিডিও ভলান্টিয়ার-এর মতো সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা আছে এমন বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্যে আমাদের লোকজনকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করি।

শুরুর দিকে আমরা চারজনকে পাঠাই—দুজন ছেলে আর দুজন মেয়ে—ওদের সঙ্গে 15 দিনের প্রশিক্ষণ নিতে। ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি কীভাবে গল্প বা বিষয় খুঁজে বের করতে হয়, ভিডিও করতে হয়, আর কীভাবে সঠিকভাবে মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে হয়, সেই বিষয়ে তাদের সাহায্য করে। এরপর তারা দুই থেকে তিন মাস খনন এলাকায় কাজ করে। সেখানে তারা রাস্তার সমস্যা, স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাবের মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করে। এসব বিষয় নিয়ে তারা দুই–তিন মিনিটের ছোট ছোট তথ্যচিত্র তৈরি করে।

ভিডিও ভলান্টিয়ার তাদের প্রতি ভিডিওর জন্য 1,000 টাকা দেয়। একই বিষয়ের ওপর যদি তারা আবার ফলো-আপ ভিডিও বানায়, তাহলে 2,000 টাকা পায়। ফলে তাদের একটি নিয়মিত আয় তৈরি হয়। এখন আমাদের 10 জন সদস্য গড়ে প্রতি মাসে 10,000–15,000 টাকা আয় করছে। এর পাশাপাশি আমরা ভালো গ্রাউন্ড রিপোর্টিংও করি। আমরা নিয়মিত এই ভিডিওগুলো ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, এবং X (আগের নাম টুইটার)–এর মতো সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করি, যাতে অন্য এলাকার মানুষও উৎসাহ পায় এবং নিজেদের জায়গায় একইভাবে কাজ করতে পারে। আমরা স্থানীয় প্রিন্ট ও ডিজিটাল মিডিয়াতেও এসব ভিডিও পাঠাই। তারা যখন খবরগুলো প্রকাশ করে, তখন আমাদের ছবি এবং পত্রিকার কাটিং পাঠায়। এতে আমাদের সদস্যরা আরও উৎসাহ পায় এবং কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী হয়।

সংগঠিত করা

1. গ্রামসভার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা

PESA আইন অনুযায়ী তফসিলি এলাকায় গ্রামসভা গ্রামের স্বশাসনের ক্ষমতা পায়। এই আইন আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। পাশাপাশি, উন্নয়নমূলক প্রকল্প অনুমোদন বা বাতিল করার ক্ষমতাও গ্রামসভার হাতে থাকে। ফলে, গ্রামসভা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে ওঠে, যেখানে মানুষ নিজেদের মতামত জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে এবং বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

এটা বুঝতে পেরে, আমরা গ্রামের মহিলা নেত্রীদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করি, যাতে তারা পঞ্চায়েত নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। বর্তমানে আমরা যাদের সঙ্গে কাজ করি, তাদের মধ্যে 15–16 জন মহিলা ও আদিবাসী সদস্য জনপদ পঞ্চায়েতের (ব্লক স্তরের পঞ্চায়েত) সদস্য। এই জনপদ পঞ্চায়েতের অংশ, যা গ্রাম পঞ্চায়েত এবং জেলা পঞ্চায়েতের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। এই পঞ্চায়েত সদস্যরা খনন এলাকায় বসবাসকারী মানুষের কল্যাণের জন্য আমাদের সঙ্গে মিলে ডিস্ট্রিক্ট মিনারেল ফাউন্ডেশন এবং CSR-এর অর্থের যেন ন্যায্য ব্যবহার হয়, সেই দাবি তুলতে সাহায্য করছেন। তারা এসব এলাকায় PDS (রেশন ব্যবস্থা) ঠিকভাবে চালু রাখতেও আমাদের সহায়তা করেছেন।

2. কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা

2011 সালে, আমরা প্রশাসনকে দেখিয়েছিলাম যে, আমরা নিজেদের জমিতে নিজেরাই কয়লা খনন করতে পারি। শুধু তাই নয়—লাভ হলে সেই লাভ গ্রামের মানুষের মধ্যেই ভাগ করে দেওয়া সম্ভব। যদিও, প্রশাসন আমাদের জানায়, এই খনন কাজ বেআইনি। কারণ কয়লা তোলার অধিকার নাকি শুধুমাত্র কোম্পানির। আমরা তাদের জানাই যে, আমাদের এখনও কোনো কোম্পানি নেই ঠিকই, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা কোম্পানি তৈরি করতে পারি। তখন কর্মকর্তারা আমাদের প্রশ্ন করেন, “আপনারা কি জানেন যে একটা কোম্পানি খুলতে কী যোগ্যতা লাগে? আর এর জন্য কত টাকা লাগে?” আমরা তাদের বলি, আমাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই এমন মানুষ আছে যারা আম্বানি বা জিন্দালদের মতোই শিক্ষিত এবং দক্ষ। আমরা তাদের এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলাম যে কোনো বড় কোম্পানি নিজের ব্যক্তিগত টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করে না। আমাদের ধারনা অনুযায়ী, সরকার যখন আমাদের জমি অধিগ্রহণ করে কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে দেয়, তখন সেই কোম্পানি সাধারণত ওই জমিটাকেই জামানত রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। এরপর সেই ঋণের টাকা দিয়েই কয়লা খননের কাজ শুরু করে। আমাদের প্রস্তাব ছিল খুবই সহজ। সরকার যদি কোনো কোম্পানিকে 40 লক্ষ টাকা দিতে পারে, তাহলে আমাদের খননের জন্য 10 লক্ষ টাকা দিক। আমরা দেখিয়ে দেব কীভাবে দৃঢ়তার সাথে এবং গ্রামের মানুষের উপকার হয় এমনভাবে খনন করা যায়।

2013 সালে ‘গারে তাপ উপক্রম প্রোডিউসার কোম্পানি লিমিটেড’ একটি কৃষক উৎপাদনকারী কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। এরপর আমরা এক বছর ধরে 1 একর জমিতে কয়লা উত্তোলন করি, যাতে প্রমাণ করা যায় যে বাইরের কোনো তহবিল ছাড়াও এই কাজ করা সম্ভব। এর পাশাপাশি, আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি—এই ধরনের একটি কোম্পানিতে মহিলা, তরুণ, যাদের নিজেদের জমি আছে এমন কৃষকদের এবং ভূমিহীন কৃষকদের ভূমিকা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। সবশেষে আমরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিই যে, আমাদের উপার্জিত অর্থ সরাসরি গ্রামসভায় জমা দেওয়া হবে। কারণ গ্রামসভা সেই অর্থ ব্যবহার করে গ্রামে স্বাস্থ্য পরিষেবা, বিদ্যুৎ এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

মানুষ আমাদের কোম্পানির জন্য তাদের জমি দিতে আগ্রহী ছিল। তারা নিজেদের জমিতে খনন করার অনুমতি দিতে জমির দলিল এবং নো-অবজেকশন সার্টিফিকেটের কপিও আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। বর্তমানে, জনগণের দেওয়া মোট প্রায় 700 একর জমি আমাদের কাছে রয়েছে। যদিও সরকার এখনও আমাদের কোনো খনি আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ করেনি, তবুও আমরা নিজেরাই শ্রম দিয়ে কয়লা খননের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

আমাদের সত্যাগ্রহ প্রতিবাদ থেকে শুরু হয়েছিল, যা এখনও আমাদের আন্দোলনের মেরুদণ্ড। | ছবি সৌজন্যে: জন চেতনা

আন্দোলন

1. আদালতে লড়াই

আমাদের কাজের প্রতিটি ধাপেই মানুষকে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য আইনি লড়াই করতে হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, 1952 সালের মাইনস অ্যাক্ট অনুযায়ী কয়লা খনিতে মহিলাদের কাজ করা নিষিদ্ধ ছিল। আমাদের জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য রাথো বাই খনি দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা ও ভাইকে হারিয়েছিলেন। যদি তিনি মহিলা না হতেন, তাহলে কোল ইন্ডিয়া তাঁকে চাকরি দিত। কিন্তু শুধু মহিলা হওয়ার কারণেই তিনি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তাই আমরা কোল ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে ছত্তিশগড় হাইকোর্টে মামলা করি। আদালতে আমাদের যুক্তি ছিল—যখন ভারতের সংবিধান লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্যকে স্বীকৃতি দেয় না, তখন মাইনস অ্যাক্ট কীভাবে তা করতে পারে? এই মামলার ফলস্বরূপ রাথো বাই চাকরি পান।

এরপর আসা যাক রথকুমারের ঘটনায়। কোল ইন্ডিয়ার খনিতে কাজ করার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। কিন্তু কোম্পানি দাবি করে, তাঁর স্বামীর নামের কেউ কখনও তাদের খনিতে কাজই করেননি। তখন আমরা রাইট টু ইনফরমেশন (RTI) আইনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করি এবং আদালতে প্রমাণ করি যে কোম্পানি মিথ্যা বলছে। শেষ পর্যন্ত রথকুমারও চাকরি পান। আজ রাথো বাই এবং রথকুমারের 

মতো আরও অনেক মহিলারা খনিতে কাজ করছেন। তাঁদের এই লড়াইয়ের গল্পগুলো আমাদের আন্দোলনের অন্যতম বড় সাফল্য।

2. প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়া

আমাদের সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হয়েছিল প্রতিবাদের মাধ্যমে, এবং আজও এই প্রতিবাদ ও আন্দোলনই আমাদের সংগ্রামের মূল চালিকা শক্তি। বছরের পর বছর ধরে এই আন্দোলন ধীরে ধীরে আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং আরও বেশি মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়। 2012 সালে, সত্যাগ্রহ আন্দোলনের দ্বিতীয় বছরে আমরা আশেপাশের গ্রামের সদস্য ও প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত সভা করতে শুরু করি। পাশাপাশি, জাতীয় স্তরে যেসব সংগঠনের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ছিল, তাদেরও আমন্ত্রণ জানাই। সেই সভাগুলিতে 16টি রাজ্য থেকে মানুষ এসে অংশ নিয়েছিল। কেউ বক্সাইট খনির কারণে, কেউ লৌহ-আকরিক খনির কারণে বা অন্যান্য কোনো কারণে সমস্যায় পড়েছিলেন। আমরা তাদের জানিয়েছিলাম যে আমরা কয়লা সত্যাগ্রহ বেছে নিয়েছি কারণ আমরা কয়লা খনির আশেপাশে বসবাস করি, কিন্তু এই আন্দোলনের পদ্ধতি এবং লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য জায়গাতেও কাজে লাগানো সম্ভব।

আমরা আমাদের সদস্যদের অন্য গ্রাম ও রাজ্যের প্রতিবাদ এবং আন্দোলনেও নিয়ে যাই, যাতে সেখান থেকে শেখা যায় এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নেওয়া যায়। আমাদের সম্পদ খুবই সীমিত, কিন্তু মানুষ নিজে থেকেই এগিয়ে আসে। আমরা গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে এক মুঠো চাল সংগ্রহ করি। যাদের সামর্থ্য বেশি, তারা আরো বেশি চাল আমাদের দেন। কেউ কেউ আবার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থও অনুদান করেন। 2024 সালে আমরা কমিউনিটি অনুদানের একটি নিয়ম চালু করেছি। যাদের 1 একর জমি আছে, তাঁরা 100 টাকা দেবেন আর যাদের 10 একর জমি আছে, তারা 1000 টাকা দেবেন। এই নিয়মের মাধ্যমে আমরা ইতিমধ্যে প্রায় 8.5 লক্ষ টাকা এবং প্রায় 40 কুইন্টাল চাল সংগ্রহ করতে পেরেছি। যখনই মিছিল, রাস্তা অবরোধ বা ধর্নার মতো কর্মসূচি হয়, তখন এই অর্থ এবং চাল আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে অনেকটা সাহায্য করে। এছাড়াও, আমরা একটি প্রজেক্টর, একটি মিউজিক সিস্টেম, একটি প্রিন্টার এবং একটি ল্যাপটপ কিনেছি। আমরা সবসময় আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখি—কত টাকা উঠেছে, কীভাবে খরচ হচ্ছে, এবং কে টাকাপয়সার হিসেব রাখছে, এসব তথ্য সবাই জানে।

চলমান বিক্ষোভের সময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যাতে পুরোপুরি ব্যাহত না হয়, সে জন্য প্রতিটি গ্রাম পালা করে একদিন করে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার দায়িত্ব নেয়। উদাহরণস্বরূপ, আজ যদি আমার গ্রামের 500 জন মানুষ বিক্ষোভে যান, তাহলে আগামীকাল আপনার গ্রামের পালা।

সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিগুলি এখানে খনি স্থাপনের চেষ্টা করলেও, রায়গড় এলাকার আশেপাশের গ্রামের মানুষ একসঙ্গে জোট বেঁধে সেই সব প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে। যতদিন তারা আমাদের জমি ও সম্পদ দখল করতে আসবে, ততদিন আমরা সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ করে যাব। আমরা আমাদের গ্রামে কয়লা খনি চাই না। কিন্তু সরকার যদি উন্নয়ন বলতে শুধু খনি স্থাপনকেই একমাত্র পথ বলে ভাবে, তাহলে সেই উন্নয়নের লাভ ও অংশীদারিত্ব থেকেও আমরা বঞ্চিত থাকতে রাজি নই।

এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI

আরো জানুন

  • কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ন্যায্যভাবে পরিবর্তনের পথে যেতে হলে ভারতের ঐতিহাসিক ভুলগুলো কেন সংশোধন করা জরুরি—তা জানতে এই লেখাটি পড়ুন।
  • ছত্তিশগড়ের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির ওপর বাণিজ্যিক খনন কীভাবে প্রভাব ফেলে—তা জানতে এই লেখাটি পড়ুন।
  • ভারতে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির জন্য নিয়মগিরি মামলার গুরুত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে জানতে এই লেখাটি পড়ুন। 
donate banner
We want IDR to be as much yours as it is ours. Tell us what you want to read.
ABOUT THE AUTHORS
রাজেশ কুমার ত্রিপাঠী-Image
রাজেশ কুমার ত্রিপাঠী

রাজেশ কুমার ত্রিপাঠী ‘জন চেতনা রায়গড়’ নামে একটি সংগঠন পরিচালনা করেন, যা ছত্তিশগড়ের আদিবাসী এলাকায় কাজ করে। এই সংগঠন মূলত পরিবেশ রক্ষা, উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন, খাদ্য সুরক্ষা, PESA আইন, বনাধিকার আইন, এবং খনি ও শিল্প সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে।

COMMENTS
READ NEXT