2025 সালের ইন্ডিয়া জাস্টিস-এর রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে ভারতে মোট বিচারাধীন বন্দীদের 42 শতাংশই এসেছে উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মহারাষ্ট্র থেকে। সারা দেশে বন্দী সংখ্যার নিরিখে বিহার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এর মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে একটি বড় অংশ—প্রায় 66 শতাংশ— বঞ্চিত ও প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ।
2019 সাল থেকে আমাদের অলাভজনক সংস্থা LAW ফাউন্ডেশন বিহারের কারাবন্দী প্রান্তিক ও বঞ্চিত সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য সামাজিক ও আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন এবং পুনরায় সমাজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কাজ করে আসছে। আমরা সেইসব বন্দীদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি, যাঁরা অনেকদিন ধরে জেলে আছেন, আদালত যাঁদের জামিন মঞ্জুর করলেও জামানত বন্ডের অভাবে যাঁরা মুক্তি পাচ্ছেন না, যাঁদের আইনজীবী রাখার সামর্থ্য নেই, অথবা যাঁদের অন্যায়ভাবে জেলে রাখা হয়েছে।
আমাদের কাজের মাধ্যমে আমরা নিজের চোখে দেখি যে কীভাবে বর্তমান ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা সমাজের প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
1. এমন এক ব্যবস্থা, যা জাতপাত ভিত্তিক হিংসা ও বৈষম্যে গভীরভাবে প্রোথিত
বিহারে দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ বর্ণের মানুষের দ্বারা জাতপাত ভিত্তিক নিগ্রহ এবং হিংসার ঘটনা ঘটে আসছে। বর্তমানে আমরা পাটনা ও জেহানাবাদ জেলায় কাজ করছি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সেই সব এলাকাগুলোকেই বেছে নিচ্ছি, যেখানে এই ধরণের হিংসার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটতে দেখা যায়।
আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, জেলের ভেতরের জীবন অনেকটাই বাইরের সমাজের মতোই স্তরভিত্তিক। সমাজে যেমন জাত, শ্রেণি ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য আছে, জেলেও ঠিক একইরকম স্তরভিত্তিক বৈষম্য বিদ্যমান।
সাম্প্রতিক এক মামলায় এর একটি উদাহরণ প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রান্তিক সম্প্রদায়ের 16 বছরের এক কিশোরকে একটি বাইক চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। থানায় নিয়ে যাওয়ার আগে পুলিশ তাকে বেধড়ক মারধর করে। থানায় 16টি CCTV ক্যামেরা থাকলেও, ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে এমন একটি ঘরে রাখা হয় যেখানে কোনো নজরদারি ছিল না।
ভারতের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় জাত আর ক্ষমতার প্রভাব এমনভাবে কাজ করে, যেখানে হিংসার ঘটনা ঘটে, প্রতিষ্ঠানগুলো নীরব থাকে বা মদত দেয়, মানুষ ভয়ে কথা বলতে পারে না, আর অন্যায়কে অস্বীকার করা হয়।
শেষ পর্যন্ত যখন তাকে যখন জুভানাইল জাস্টিস বোর্ড–এর সামনে হাজির করা হয়, তখন প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট দোষী পুলিশ ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। ওই সকল কর্মকর্তাই একই প্রভাবশালী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ হওয়ায় বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়। তাঁরা দাবি করেন যে ছেলেটি নাকি অভ্যাসগত অপরাধী এবং সে নাবালক নয়। মামলাটি চিফ জাস্টিস ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গেলে, তীব্র জাতভিত্তিক বৈষম্যের কারণে ছেলেটির পক্ষে কোনো আইনজীবী মামলা লড়তে চান নি। আমরা তার পাশে দাঁড়িয়ে আইনি সহায়তা দিচ্ছি, কিন্তু বিচারক ও পুলিশসহ অনেক ক্ষমতাবান মানুষই আমাদের তাকে সাহায্য না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
এর থেকে বোঝা যায় যে ভারতের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় জাত আর ক্ষমতার প্রভাব কীভাবে কাজ করে– হিংসার ঘটনার মাধ্যমে, প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরব সমর্থনে, ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, আর অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে।
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে আইনজীবী (বার) এবং বিচারক (বেঞ্চ)—দু’জায়গাতেই প্রান্তিক ও বঞ্চিত সম্প্রদায়ের মানুষদের অংশগ্রহণ বাড়ানো খুবই জরুরী। আমরা ইচ্ছে করেই এই সব সম্প্রদায়ের আইনজীবীদের নিয়োগ করি, যাঁরা অধিকাংশ সময়েই কাজের সুযোগ পান না। ভারতের বেশিরভাগ আদালত, বিশেষ করে জেলা আদালতগুলি, এখনো মূলত পুরুষ এবং উচ্চবর্ণের মানুষের দখলে রয়েছে। সমাজে যাঁরা ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী, তাঁদেরই প্রতিনিধিত্ব সেখানে বেশি দেখা যায়। কিন্তু যাঁরা সমাজে সবচেয়ে বেশি অন্যায়ের শিকার, তাঁদের কথা বোঝার মতো মানুষ যদি বিচারব্যবস্থায় না থাকেন, তাহলে ন্যায়বিচার সবসময় একপেশে হয়েই থাকে।
2. পক্ষপাতের কারণে অন্যায়ভাবে জেলবন্দী রাখা
প্রান্তিক বা বঞ্চিত সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি একবার গ্রেপ্তার হলে, অনেক সময় তাঁকে শুধু একটি মামলায় নয়, বরং একই ধরণের একাধিক ওপেন FIR-এ অভিযুক্ত করা হয়। এমনকি অভিযুক্ত ব্যক্তি একটি চুরির ঘটনার সাথে যুক্ত থাকলেও, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই অন্য আরো চার থেকে পাঁচটি মামলায় তাঁকে জড়ানো হয়। এর কারণ হলো, পুলিশ দেখাতে চায় যে তাঁরা পুরনো ঝুলে থাকা মামলাগুলির সমাধান করে ফেলেছে।
মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে থাকা জাতপাত এবং পক্ষপাতের কারণে দলিত, আদিবাসী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের খুব সহজেই অভিযুক্ত করা হয়। কখনো তাঁরা কোনো ছোটখাটো অপরাধে জড়িত থাকতে পারে, আবার অনেক সময় শুধু ঘটনাস্থলের আশেপাশে উপস্থিত থাকার কারণেই মামলায় তাঁদের নাম জুড়ে দেওয়া হয়। এমনকি কখনো কখনো কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এরকমই এক ঘটনায়, এক রিকশাচালককে রেলস্টেশনে ঘুমানোর সময় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে তাঁকে এমন এক মামলায় ফাঁসানো হয়, যে ঘটনাটা ঘটেছিল একেবারেই অন্য জায়গায়।
এর ফলে অভিযুক্তরা এক ভয়ংকর চক্রে আটকে পড়েন। তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না, তাও আবার একাধিক আদালতে, একাধিক মামলার জন্য এবং ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। অনেক ক্ষেত্রে জেলা আদালত এসব মামলায় জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়, বিশেষ করে যখন একাধিক FIR রুজু হয়ে থাকে। তখন অভিযুক্তের পরিবারকে বাধ্য হয়ে উচ্চ আদালতে যেতে হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতে জামিনের জন্য আবেদন করার খরচ অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত খরচের ভয়ে অনেকেই উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সাহসই পান না।
আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে অনেক সময় জামিন আবেদনের কাগজপত্র সব ঠিকঠাক থাকলেও, পাটনা উচ্চ আদালতে পুরনো মামলার চাপ এত বেশি যে জামিন আবেদন তালিকাভুক্ত হতেই এক মাসের বেশি সময় লেগে যায়। এর ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ হলেও তাঁকে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েক মাস পর্যন্তও হাজতবাস করতে হয়।
ফলে অনেক সময় এমনও হয় যে, দোষী প্রমাণ হলে যে শাস্তি হতো, তার থেকেও বেশি সময় অভিযুক্ত জেলে কাটিয়ে দেন। মাসের পর মাস বা কখনো কখনো কয়েক বছর ধরে জেলে কাটানোর পর অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং এর ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা যে অপরাধ করে নি তার দায় স্বীকার করে নেন।
3. জেলা পর্যায়ে দক্ষ আইনজীবীর ঘাটতি
অনেকের মনে একটি ভুল ধারণা আছে যে ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত বা সর্বোচ্চ আদালত থেকেই পাওয়া যায়। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের জন্য আসল লড়াইটা হয় জেলা আদালতেই। উচ্চ আদালতে সাধারণত সরাসরি বিচার হয় না—সেখানে মূলত আপিল ও জামিনের আবেদনের শুনানি হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিন, অভিযোগ গঠন, বিচার শুরু থেকে শুরু করে রায় দান পর্যন্ত—এই পুরো প্রক্রিয়াটাই চলে নিম্ন আদালতে। এই জেলা আদালতগুলোতেই সবচেয়ে বেশি কাজের চাপ থাকে, অথচ এই আদালতগুলিতেই ভালো আইনজীবীর অভাব রয়েছে, সুযোগ-সুবিধাও কম, আর কাজের গুরুত্বও সঠিকভাবে স্বীকৃতি পায় না।
এর ফলে, জেলা আদালতগুলিতে আগ্রহী এবং দক্ষ আইনজীবীর বড় অভাব দেখা যায়। বেশিরভাগ আইনজীবীই উচ্চ আদালত বা সর্বোচ্চ আদালতে প্র্যাকটিস করতে চান। এর ফলে, জেলা আদালতে মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এমনকি ছোটখাটো চুরির মামলাতেও 10-15 বছর লেগে যায়।
আমাদের সাথে প্রায়শই এমন দোষী সাব্যস্ত বন্দীদের সাথে দেখা হয় যারা সমাজের প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষ এবং যারা উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা কখনই ভাবেননি। এর কারণ এটা নয় যে তাঁরা অপরাধী তাই, বরং অর্থের অভাব এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগ বা সহায়তা না থাকায় তাঁরা আদালতের এই পথেই পা রাখতে সাহস পান না।
স্বীকৃত আইন কলেজগুলিতে পড়াশোনা শেষ করার পর ছাত্রছাত্রীদের জন্য অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর জেলা আদালতে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। কারণ সেরা জায়গা থেকে শিক্ষা লাভের পরেও, অনেক তরুণ আইনজীবী এই স্তরে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন না, জেলা আদালতের বাস্তব পরিস্থিতি ও কাজের ধরণ সম্পর্কে স্বল্প অভিজ্ঞতার কারণে।

4. যে সব প্রক্রিয়ায় পরিবার জড়িত থাকে সেই প্রক্রিয়াগুলি সামলানো কঠিন হয়
ভারতের আদালতে জামিন পাওয়ার একটি ছোট্ট আনুষ্ঠানিক শর্ত হলো—সাধারণত কোনো নিকট আত্মীয়ের করা হলফনামা। কিন্তু এই সামান্য শর্তটাই অনেকের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবারকে খুঁজে পাওয়া যায় না, বা তাঁরা সামনে আসতে চান না। তাঁরা মূলত পুলিশের ভয় পান, এবং আইনি প্রক্রিয়াটাও তাদের কাছে অপরিচিত। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পরিবারের প্রধান হন, তাহলে তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবারটি আর্থিকভাবে খুব অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে যায়। আবার তিনি যদি একজন পরিযায়ী হন, তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাঁর কাছে নাও থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সমাজকর্মীরা পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আইনি প্রক্রিয়া বুঝতে ও সামলাতে সাহায্য করেন, এবং কারাবন্দীদের সাথে তাঁদের স্বজনদের দেখা করাতেও সহায়তা করেন।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, অনেক অভিযুক্ত মানুষেরই কোনো আত্মীয় পরিজন থাকে না, অথবা পরিবার তাঁদের পরিত্যাগ করেছে। এমনই একটি ঘটনায়, একজন সাফাই কর্মীকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, কারণ তাঁকে একটি অপরাধস্থলের কাছে মদ্যপ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর এক ভাই ছিল, কিন্তু তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর ফলে তিনি কোনো বিচার ছাড়াই তিন থেকে চার বছর জেল খাটেন। আমরা তাঁর পক্ষে একটি হলফনামা জমা দিয়েছি। কিন্তু যেহেতু আমরা তাঁর পরিবারের কেউ নই, তাই পুরো প্রক্রিয়াটি খুব ধীর গতিতে এগোচ্ছে এবং জটিলও হয়ে পড়েছে। আদালত এই বিষয়টি স্বীকৃতি দিতে অনেক সময় নিতে পারে। আমাদের আইনি ব্যবস্থায় এ ধরণের ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির জন্য আলাদা কোনো পরিকাঠামো নেই। যাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই, আইন ব্যবস্থা তাঁদের কথা মাথায় রেখে তৈরি নয়।
রূপান্তরকামী বা ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা আরও বেশি বঞ্চনামূলক। অনেক সময় তাঁদের পরিবারই তাঁদের গ্রহণ করে না এবং তাঁদের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে দেয়। সাধারণত তখন অন্য কোনো রূপান্তরকামী ব্যক্তি বা কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাঁদের পক্ষে হলফনামা দিতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু আদালত এসব সম্পর্ককে আইনি স্বীকৃতি না দেওয়ায়, অনেক ক্ষেত্রে সেই হলফনামাগুলো গ্রহণই করা হয় না।
5. জামিন পাওয়াটাই এখানে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়
বিহারে, জামিনের প্রচলিত ব্যবস্থা মূলত জামানত বন্ড ও সম্পত্তির কাগজপত্রের ওপর নির্ভরশীল। যিনি জামিন চাইছেন, তাঁকে জমির মালিকানা বা গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের মতো নথি দেখাতে হয়। এখানে নগদ জামিনের কোনো চল নেই। ফলে যাঁদের এ ধরণের কোনো সম্পদ নেই, তাঁদের জন্য জামিন পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে যায়।
এর সমাধান হিসেবে আমরা পার্সোনাল রিকগনিসেন্স (PR) জামিন ব্যবস্থার পথ ধরেছি। PR জামিনে অভিযুক্তকে সম্পত্তি বা টাকা জামানত হিসেবে দিতে হয় না। আদালতের সমস্ত শুনানিতে হাজির হবেন এমন প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে অভিযুক্ত মুক্তি পান, তাঁকে কোনো সম্পত্তির কাগজপত্র বা জামানত বন্ড দিতে হয় না।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় আমাদের সমাজকর্মীরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেক বিচারাধীন বন্দীদের পরিবারকেই সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যেসব পরিবারকে খুঁজে পাওয়া গেল, তাঁরা প্রায়ই এতটাই আর্থিক বা সামাজিকভাবে দুর্বল যে তাঁরা এগিয়ে আসতে পারেন না। এই শূন্যতা পূরণ করতে, আমরা বন্দীদের বাড়ি যাই, সেখানে গিয়ে তাঁদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করি এবং প্রমাণের জন্য ছবি তুলি।
এরপর এই সব তথ্য আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে আমরা এই বিষয়ে সওয়াল করি যে, যেসব পরিবারের পক্ষে জামানত বন্ড দেওয়া সম্ভব নয়, সেইসব ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে PR জামিনে মুক্তি দেওয়া উচিত। আদালত যদি এই আবেদন গ্রহণ করে, তাহলে সেই ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর হয়। আর যদি আবেদন খারিজ হয়, তাহলে আমরা বিষয়টি জেলা বিচারপতির কাছে নিয়ে যাই এবং প্রয়োজনে হাইকোর্ট পর্যন্ত যেতে পিছপা হই না।
যদি মামলায় দায়িত্বে থাকা আইনজীবী মামলাটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেন, তাহলে এই ধাপগুলো অনেক সময়ই অনুসরণ করা হয় না। কয়েদীদের সাধারণত নিজেদের বিকল্পগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকে না, আবার বারবার আপিল করার মতো সামর্থ্য বা জ্ঞানও তাঁদের নেই। PR জামিন ব্যবস্থার সঙ্গে শক্তিশালী আইনি সহায়তা পেলেই ন্যায়বিচারের বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়।
6. জামিনে মেলে ক্ষণিকের স্বস্তি; কিন্তু প্রকৃত শান্তি আনে কেবল সুবিচার
জামিন পেলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সাময়িক স্বস্তি পান, কিন্তু প্রকৃত শান্তি আসে কেবল সুবিচার ও মুক্তির মাধ্যমে। ধরুন, চুরির মতো কোনো মামলায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর। যদি কোনো ব্যক্তি বিচারাধীন অবস্থায় ইতিমধ্যেই আড়াই বছর জেলে কাটিয়ে ফেলেন, তাহলে সেই পর্যায়ে জামিন পাওয়া তাঁর জন্য বিশেষ স্বস্তি নিয়ে আসে না।
জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালতের প্রতিটি শুনানির তারিখে হাজির থাকতে হয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য, প্রতিবার আদালতে যাওয়া মানে যাতায়াতের খরচ, সেই দিনের মজুরি হারানো বা জীবিকা অর্জনে ক্ষতি, আর কাজের খোঁজে অন্যত্র না যেতে পারার প্রতিবন্ধকতা। অভিযুক্ত যদি শুধুমাত্র শুনানির একটি তারিখেও আদালতে হাজির হতে না পারে তাহলে তাঁর জামিন বাতিল হয়ে যেতে পারে, এবং এমনকি তাঁকে আবার জেলেও যেতে হতে পারে।
তাই সময়মতো বিচার সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ সাজা প্রায় পূর্ণ করে ফেলেছেন। এমন পরিস্থিতিতে, জামিন অনেক সময় স্বস্তির বদলে বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ সাক্ষী হাজির না হওয়া বা সময়মতো চার্জ গঠন না হওয়ার মতো ব্যবস্থাগত বিলম্বের কারণে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এই অবস্থায় বিচারই অভিযুক্তের জন্য চূড়ান্ত সমাধান এনে দেয়। আর যদি তিনি মুক্তি পান, তাহলে তাঁর সম্মান ফিরে আসে এবং সারা জীবন অপরাধীর তকমা বয়ে বেড়ানোর থেকে তিনি রেহাই পান।
বিনামূল্যে আইনি সহায়তা: নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
আইন অনুযায়ী, দোষ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক অভিযুক্তকেই নির্দোষ বলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে, এই নীতিটি অনেক সময় মানা হয় না। যখন বিচারব্যবস্থা অভিযুক্তের পাশে থাকে না, তখন আমরা সচেতনভাবে তাঁকে বোঝার চেষ্টা করি। বিহারের মতো রাজ্যে, প্রতি 50 কিলোমিটার অন্তর ভাষার পরিবর্তন ঘটে। এমনই এক ঘটনায়, একজন মহিলা জেলের জীবন কাটাতে বাধ্য হন কারণ তাঁর কথা শোনার এবং বোঝার জন্য সময় এবং উদ্যোগ কেউ নেন নি। পরে তাঁর ভাষায় কথা বলতে পারেন—এমন একজন সমাজকর্মীর সহায়তায় জানা যায়, তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ সত্য ও যুক্তিযুক্ত; আর সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়।
মানুষ যখন আইন সম্পর্কে জানে, তখন তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং দমন বা নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করতে পারে।
প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার পেতে হলে আইনি সহায়তার পাশাপাশি আইনি শিক্ষা ও সচেতনতা কর্মসূচি অপরিহার্য—বিশেষত জেলের ভেতরে এবং সেই সব সম্প্রদায়ের মধ্যে, যেখানে পুলিশের হস্তক্ষেপ নিয়মিত ঘটনা। এমনই এক ঘটনায়, জেলে আমাদের সেশনে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এক তরুণ তাঁর পরিবারকে জানায় যে সে জুভেনাইল জাস্টিস আইনের আওতায় সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। এর ফলে সময়মতো হস্তক্ষেপ সম্ভব হয়। আরেকটি ঘটনায়, মুসাহার তোলার এক কিশোরী পুলিশি অভিযানের সময় নিজের অবস্থানে অটল থাকে এবং অভিযানের সময় একজন মহিলা পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি আবশ্যক—এই আইন উল্লেখ করে পুলিশের কর্মকর্তাদের তার বাড়িতে প্রবেশে বাধা দেয়। এরপর আর কখনো পুলিশ তার বাড়ি যায় নি।
ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ 39(A) অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিক বিনামূল্যের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারী, এবং এই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যায় না। তাই আমাদের দেশের রাজ্যগুলির ক্ষমতাসীন সরকারের উচিত বিনামূল্যের আইনি পরিষেবার মূল উদ্দেশ্য ও ভাবনাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলি চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সমাধানে জোর দেওয়া—বিশেষত জেলা ও তালুক স্তরে।
কিন্তু এই অধিকারগুলির কথা প্রান্তিক মানুষদের কাছে অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই পৌঁছতে দেওয়া হয় না—কারণ মানুষ আইন জানলে, তাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়নের বিরোধিতা করতে পারে। তাই আমাদের কাজ শুধু মামলার লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ নয়। ন্যায়বিচারে পৌঁছতে হলে মানুষের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানাও জরুরি।
এই নিবন্ধটিতে অবদান রেখেছেন শালিনী, আনন্দ, রঞ্জন, খালিদ ও গৌরব।
এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI।
—





