বিমুক্ত জাতির মানুষরা প্রতিনিয়ত বৈষম্য ও অবিচারের শিকার হন এবং সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁরা অনেক সময় বঞ্চিত থাকেন। তাঁদের মানসিক সুস্থতা বা মানসিক স্বাস্থ্যকে এই সংগ্রাম ও কঠিন বাস্তবতা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।

Read article in Hindi
7 min read

আমি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সামাজিক ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছি। বিভিন্ন এনজিও ও অ-লাভজনক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝতে পেরেছি, ভারতের সামাজিক ক্ষেত্র এখনও আমার সম্প্রদায়ের মতো অনেক সম্প্রদায়ের সমস্যাকে প্রকৃত অর্থে গুরুত্ব দিয়ে বোঝার চেষ্টাই করেনি। আমি ঘিসাদি গাডিয়া লোহার সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা একটি বিমুক্ত জাতি (DNT)। পরিযায়ী ও বিমুক্ত জাতিগোষ্ঠী (NT-DNT)-কে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা 1871 সালে ‘ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট’ চালু করে অন্যায়ভাবে ‘অপরাধী জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এর ফলে এই সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষগুলি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিকভাবে কলঙ্কিত হয়েছে এবং নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছে। এমনকি 1952 সালে আইনটি বাতিল হওয়ার পরও মানুষের মনে এই বৈষম্য এবং অবিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে আজও রয়ে গেছে।

সামাজিক ক্ষেত্রের কাছে NT-DNT-এর মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জটিল বাস্তবতা বোঝার মতো যথাযথ ভাষা বা গভীর উপলব্ধি এখনও তৈরি হয়নি। NT-DNT সম্প্রদায়কে প্রায়ই বিভিন্ন সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগ থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বৈষম্য ও অবহেলার প্রভাব যে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা গভীরভাবে পড়ে—সে বিষয়ে খুব কমই লেখা বা আলোচনা দেখা যায়। শৈশব থেকে নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমি বুঝেছি, প্রান্তিক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে তাঁদের সামাজিক উন্নতি, মর্যাদা, শিক্ষা এবং অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। এই বাস্তবতা মাথায় রাখলে প্রশ্ন ওঠে—দেশে বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে আলোচনা চলছে, যেখানে এখনও অনেকেই মানসিক সুস্থতাকে শুধুমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে দেখেন, সেখানে NT-DNT-এর মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব?

চিকিৎসা সংক্রান্ত আলোচনার চেয়েও বেশি কিছু

কেউ যদি অতিরিক্ত উত্তেজিত থাকেন বা উদাসীন আচরণ করেন, তখন অনেক সময় আমরা ধরে নিই যে তিনি মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন এবং তাঁর চিকিৎসা দরকার। আবার কারও ক্ষেত্রে উদ্বেগ (অ্যাংজাইটি) বা বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন) রোগ ধরাও পড়তে পারে। কিন্তু এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা এমন, যেন একজন মানুষের সমস্যার আসল কারণ না খুঁজেই শুধু উপসর্গ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো। বর্তমান মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনায় অনেক সময় একজন মানুষকে কেবল “উদ্বিগ্ন” বা “বিষণ্ন” ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেই আলোচনা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মূল কারণ কে খুঁজে বের করবে? আমি মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞ নই। তবে আমি এটুকু বুঝি যে ইতিহাসে মানসিক সমস্যাকে মোকাবিলা করার জন্য নানা বিকল্প উপায় ছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকরও হয়েছিল। যদিও সেসব পদ্ধতির অনেকটাই লিখিতভাবে নথিভুক্ত হয়নি।

What is IDR Answers Page Banner

সাবিত্রীবাই ফুলের কাজের কথাই ধরুন। তিনি শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়েই বেশি কাজ করতেন, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই ভুলে গেছেন যে তিনি অবিবাহিত মহিলা, বিধবা, এবং যৌন হিংসা ও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার মহিলাদের নিয়েও কাজ করতেন। যখন এই মহিলাদের পিঠ একেবারে দেওয়ালে ঠেকে যেত, তখন তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করতেন। সাবিত্রীবাই তাঁদের নিজের বাড়িতে নিয়ে আসতেন এবং তাঁদের কথা মন দিয়ে শুনতেন। এটা কি আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং কাউন্সেলিং-এর কাজ নয়? তিনি কি তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেননি? হয়তো তিনি পেশাদার কাউন্সেলরের সংজ্ঞার মধ্যে পড়েন না, কিন্তু প্রান্তিক মানুষের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা অবিচার ও নিপীড়নের বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর গভীর উপলব্ধি ছিল। শুধু তাই নয়, তিনি সেই পরিস্থিতি বদলাতেও সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে আমরা প্রায়শই নিজেদের প্রশ্ন করি: অন্যরা যা করতে পারে, আমি কেন সেটা করতে পারি না? | ছবি সৌজন্যে: Pexels

অন্যায়ের কোন জাদুকরী নিরাময় নেই

আমি দ্বাদশ শ্রেণিতে আমার স্কুলে দ্বিতীয় হয়েছিলাম, কিন্তু তারপরও অনেক বছর পর্যন্ত আমি উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারিনি। সব সময় আমার মনে হতো, আমি যথেষ্ট যোগ্য নই বা আমার ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় কম। এই বিষয়টা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে যে, আমার আত্মবিশ্বাসের এই ঘাটতি আসলে সমাজব্যবস্থার বৈষম্য ও নিপীড়নেরই ফল।

হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের সমাজের মানুষদের বারবার বোঝানো হয়েছে যে, তাঁরা সমাজের সুবিধাভোগী কিছু মানুষের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের মানুষ।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে আমরা প্রায়শই নিজেদের প্রশ্ন করি: অন্যরা যা করতে পারে, আমি কেন সেটা করতে পারি না? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে না পেলে, আর আমাদের সাহায্যের জন্য আমাদের পাশে কাউকে না পেলে, আমরা নিজেরাই নিজেদের দোষ দিতে শুরু করি, এমনকি নিজের সম্প্রদায়কেও দায়ী করি। কিন্তু আমাদের মনে এই ধারণাগুলো আসে কোথা থেকে? এটা কি কোনো লুকিয়ে থাকা মানসিক রোগের ফল? না। এটা আসলে বৈষম্য এবং সামাজিক শ্রেণিব্যবস্থার ফলাফল। আমাদের এমন আলোচনা দরকার, যেখানে মানসিক চাপের আসল কারণগুলিকে সামনে এনে কথা বলা হবে।

হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের সমাজের মানুষদের বারবার বোঝানো হয়েছে যে, তাঁরা সমাজের সুবিধাভোগী কিছু মানুষের তুলনায় নিচু স্তরের মানুষ। প্রতিদিনের কথাবার্তায় তাঁরা শুনেছে কীভাবে তাঁদের জাতকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা হয়। তাঁরা মহাকাব্যে পড়েছে এবং লোকমুখে প্রচলিত গল্প শুনেছে, যেখানে অসুরদের দানব হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি ঝাড়খণ্ডে যান, তাহলে বুঝতে পারবেন—অসুর আসলে একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও পরিচয় রয়েছে। এমনকি আজও যখন বিমুক্ত জাতির (DNT) মানুষদের অনেক সময়েই চুরি, ঘরভাঙা, ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মতো মিথ্যা অভিযোগের মামলায় ফাঁসানো হয়, এই মানুষদের তাঁদের অপরাধমূলক অতীতকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। মনে হয় যেন আমাদের সব সময়ই বলা হচ্ছে—আমরা যদি নিজেদের নির্ধারিত গণ্ডির বাইরে যেতে চাই, যদি মুখ খুলি, তাহলে তার ফল আমাদের ভোগ করতে হবে।

আমাদের বলা হয় যে ব্রিটিশরা NT-DNT (যাযাবর ও বিমুক্ত জাতি) সম্প্রদায়ের জমি ও সম্পদ কেড়ে নিয়েছিল। এটা সত্যি, কিন্তু বাস্তবে সেই কাজটা মূলত করেছিল জমিদারেরাই। পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল বর্ণ, শ্রেণি এবং লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতের এক ভয়ংকর মিশ্রণ—এবং এই অন্যায় আজও চলছে। অনেক NT-DNT সম্প্রদায় বেঁচে থাকার তাগিদে পরিযায়ী জীবনযাপন করে। কিন্তু যদি তাঁরা স্থায়ীভাবে কোথাও বসতি গড়তে চায়, তাহলে কি তাঁদের জন্য জমি কোথাও আছে? সমাজের বাকি মানুষেরা কি তাঁদের জমি এবং বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সম্পদ প্রদান করতে প্রস্তুত?

donate banner

মানসিক স্বাস্থ্যকে সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েও দেখতে এবং বুঝতে হবে।

আজ, আমরা বিভিন্ন এনজিও এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বলতে শুনি যে, সমাজের প্রান্তিক মানুষদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা জরুরি। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যকে সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েও দেখতে এবং বুঝতে হবে। আর আমাদের এগোতে হবে মানসিক ন্যায়বিচারের (মেন্টাল জাস্টিস) দিকে। আমার দৃষ্টিতে মানসিক ন্যায়বিচারের ধারণার মধ্যে শুধু কাউন্সেলিং বা চিকিৎসা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের উন্নয়ন, সুযোগ-সুবিধা, অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের অধিকার নিশ্চিত করা। ভারতের সংবিধান যেসব অধিকার মানুষের জন্য সুরক্ষিত রেখেছে, সেগুলোর পক্ষে কথা বলা এবং বাস্তবে তা কার্যকর করতে সাহায্য করাও মানসিক ন্যায়ের অংশ।

মানসিক ন্যায়বিচারের একটি রূপরেখা

প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া মানুষকে দমিয়ে রাখার সামাজিক ব্যবস্থাগুলি দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হয়েছে। কোনো অলাভজনক সংস্থার পক্ষেই একদিনে, এক সপ্তাহে বা এমনকি কয়েক বছরেও এই ব্যবস্থাগুলিকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলা সহজ হবে না। কিন্তু এই কাজটা কোথাও একটা শুরু করা প্রয়োজন।

আমি 2016 সালে ‘অনুভূতি ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করি, যাতে একেবারে তৃণমূল স্তরের সম্প্রদায়ের মধ্যে নেতৃত্ব গড়ে তোলা যায় যাতে তাঁরা নিজেরাই নিজেদের প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারে, নিজেদের অভিজ্ঞতার পেছনের সত্যটুকু খুঁজে বের করতে পারে এবং বহুজন সমাজের শক্তিশালী ও প্রগতিশীল ইতিহাসকে নতুন করে চিনে নিয়ে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে পারে। তাঁরা নিজেরাই তাঁদের সমস্যার আসল বিশেষজ্ঞ এবং তাঁরা বৃহত্তর বৌদ্ধিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ ও অবদান রাখতে সক্ষম।

আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝেছি যে, মানসিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে কেবলমাত্র মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েই আলাদাভাবে কাজ করতে হবে—এমনটা নয়। একটি সংগঠন যে কাজ আগে থেকেই করে আসছে, সেই কাজের সাথেই এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

1. অ্যাকশন রিসার্চ পরিচালনা করা

অনুভূতি-তে, আমরা অধিকাংশ শিক্ষা পাই সেইসব সম্প্রদায়গুলির কাছ থেকে। যেখানে তারা বসবাস করে সেখানে গিয়ে তাদের সাথে মিশে এবং তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তাদের সাথে কথা বলে। সম্প্রতি, মহারাষ্ট্রের থানে জেলার NT-DNT কমিউনিটিগুলির ওপর একটি সমীক্ষা করতে গিয়ে আমরা জানতে পারি যে, কিছু মানুষ শৌচাগার বা স্যানিটেশনের সুবিধা পাওয়ার আশাও করেন না, কারণ তাঁরা যে জমিতে বসবাস করেন তা তাঁদের নিজেদের জমি নয় এবং তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় কোনো কাগজপত্রও নেই। তাই আমরা বুঝতে পারি, তাঁদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে জানা দরকার, এবং কীভাবে সেই অধিকারগুলি পাওয়া সম্ভব তাও তাঁদের জানতে হবে। পাশাপাশি, তাঁদের প্রয়োজন এমন কিছু স্থানীয় প্রতিনিধির, যারা নিজেদের জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই উঠে আসবেন। কোনো এনজিও বা অ-লাভজনক সংস্থা যদি প্রান্তিক মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করার আগে শুধুমাত্র তাঁদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনে, তাহলেই তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে অবগত হতে পারবে।

2. যোগাযোগের জন্য উপযুক্ত ভাষা খোঁজা

অ-লাভজনক সংস্থাগুলিকে এমন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যা তারা যে জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছে, সেই জনগোষ্ঠী সহজেই বুঝতে পারে। অবশ্যই সেই জনগোষ্ঠীর স্থানীয় বা আঞ্চলিক ভাষা জানা দরকার, কিন্তু তার পাশাপাশি তাদের বাস্তবতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা অর্জন করাও প্রয়োজন। শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক বা বইয়ের ভাষা ব্যবহার করলে কাজ হবে না। যোগাযোগের সময় যে উদাহরণ বা গল্প দেওয়া হবে, সেগুলোও সেই জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা উচিত।

অনুভূতি নিজেদের ভুল থেকে শিখেছে এবং এখনও শিখছে। একবার আমাদের একজন কাউন্সেলর একজন মহিলাকে কাজের পর বই বই পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন,  কিন্তু সেই কাউন্সেলর জানতেন না যে ওই মহিলা রাত 3টা পর্যন্ত কাজ করেন। এই ধরনের পরামর্শ মানুষের বাস্তব জীবনকে উপেক্ষার এবং তাঁদের পরিস্থিতিকে গুরুত্ব না দেওয়ারই নামান্তর।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় হলো—মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাকে আমরা অনেক সময় অকারণে জটিল করে ফেলি। অনুভূতি-তে আমরা এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা শুরু করেছি, যেখানে মানুষ ছবি আঁকে, গান গায়, কবিতা লেখে এবং সৃজনশীল প্রকাশের অন্যান্য রূপ অন্বেষণ করবেন। এটি তাঁদের দুঃখ, যন্ত্রণা বা একাকীত্বের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার একটি মাধ্যম হতে পারে—এবং বাইরের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি বা ব্যাখ্যা তাঁদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলারও একটি সুযোগও তৈরি করতে পারে।

3. বিনিময়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা

উন্নয়নমূলক কাজ এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা পেশাজীবীদের প্রান্তিক সম্প্রদায়ের কাছে শেখার মানসিকতা ও উন্মুক্ত মনোভাব নিয়ে যোগাযোগ করতে হবে।এতে এই ধরনের কাজের মধ্যে যে স্বাভাবিক ক্ষমতার অসমতা থাকে, তার কিছুটা হলেও ভারসাম্য আনা সম্ভব হয়। সম্প্রদায়ের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুবিধা এবং অন্যান্য সহায়তা পাওয়ার পথে সাহায্য করার পাশাপাশি, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাঁদের কাছ থেকে কিছু শেখার মানসিকতাও থাকা জরুরি। কারণ সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত না করলে কোনো সমাধানই সম্ভব নয়। আর সেই মূল কারণ কী কী—তা জানা যাবে শুধুমাত্র তখনই, যখন আপনি সত্যিই শিখতে এবং বুঝতে প্রস্তুত থাকবেন।

4. ক্ষতিকর ধারণাগুলো ভেঙে ফেলা

উন্নয়ন ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষেত্রগুলির প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও তাঁদের জীবনসংগ্রামের আখ্যানকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বারবার এমন একটা ধারণা তৈরি করে যে মানুষ অসহায়। যারা ছোটবেলা থেকেই নিজেদের পরিচয় ও সংস্কৃতি নিয়ে নেতিবাচক এবং অপমানজনক গল্প শুনে বড় হয়েছে, তাঁদের জন্য এই ধরনের মনোভাব মোটেও উপকারী নয়। এর পরিবর্তে আমাদের উচিত তাঁদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সমৃদ্ধি চিনতে এবং তা তুলে ধরতে সাহায্য করা। একই সঙ্গে, তাঁদের বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণগুলো কী—সেটা অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বুঝতে এবং বোঝাতে উদ্যোগী হওয়া।

সমাজ অনেক সময় ধরে নেয় যে যাযাবর সম্প্রদায়গুলো উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—তাদের নিজস্ব মানচিত্র রয়েছে, নদী ও ঋতুর পরিবর্তন সম্পর্কে রয়েছে গভীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান, আর সেই জ্ঞানই তাদের চলার পথ ও জীবনযাত্রা নির্ধারণ করে। তাই এই সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে কথোপকথন হওয়া উচিত এমন এক শক্তি জোগানো বয়ানের ভিত্তিতে, যা তাদের নিজেদের ক্ষমতা ও পরিচয়ের ওপর বিশ্বাস রাখতে সাহায্য করে।

যেহেতু অনুভূতি বহুজন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করে, তাই আমরা বহুজন আন্দোলন এবং আম্বেদকরপন্থী রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করি। আমরা শিশুদের পুনের সাবিত্রীবাই ফুলের ভিড়ে ওয়াড়া স্কুলে নিয়ে যাই, যাতে তারা সেই জায়গাটি দেখতে পারে—যেখানে বহু প্রথম প্রজন্মের বহুজন মহিলা তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন। আমরা মনে করি, একটি ঘরের মধ্যে বসে বক্তৃতা শোনার চেয়ে এই ধরনের ফিল্ড ভিজিট এবং তার পরের আলোচনা শিশু, যুবক-যুবতী, মহিলা এবং জনগোষ্ঠীর নেতাদের নিজেদের সমাজের নেতৃত্ব, ঐতিহ্য এবং মানসিক শক্তি সম্পর্কে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে।

5. আইন, অধিকার এবং নীতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা

ভারতে মানসিক স্বাস্থ্য আইন, 2017-এর মতো বেশ কিছু প্রগতিশীল আইন রয়েছে, যা তৈরি করা হয়েছে—যাতে যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন, তারা সবাই সেই পরিষেবা পেতে পারে। এছাড়াও ভারতীয় সংবিধান হলো আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষজন নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ব্যবহার করতে পারে। কারণ আমাদের মৌলিক অধিকার  কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের বৈষম্য করে না। তাই মানুষের মধ্যে তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি, এবং সেই অধিকারগুলি কীভাবে বাস্তবে পাওয়া সম্ভব—সে পথ খুঁজে পেতে তাদের সাহায্য করাও প্রয়োজন।

সংস্থাগুলিকেও নিজেদের মধ্যে এমন নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে, যা তাদের টিম এবং কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের বৈষম্য থেকে সুরক্ষা দেবে।

এ ছাড়া সংস্থাগুলিকেও নিজেদের মধ্যে এমন নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে, যা তাদের টিম এবং কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের যে কোনো ধরণের বৈষম্য, যেমন তা জাতভিত্তিক হোক বা লিঙ্গভিত্তিক, বা অন্য যে কোনো ধরনের বৈষম্য থেকে সুরক্ষা দেবে এবং তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করবে। যখন কোনো সংস্থা নীতিমালা প্রণয়ন করে, তখন তাদের উচিত সমস্ত অংশীদারদের—তহবিলদাতা, কর্মচারী, বোর্ড সদস্য এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের—সেই নীতিগুলো পড়ার, পর্যালোচনা করার এবং প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দেওয়া। এটি একটি উন্মুক্ত, স্বাস্থ্যকর এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানসিক ন্যায়বিচারকে উৎসাহিত করে এমন একটি ইতিবাচক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

সামাজিক ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকারগুলি নতুনভাবে নির্ধারণ করতে হবে

প্রান্তিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল গড়ে তুলতে সামাজিক ক্ষেত্রের সামনে এখনও অনেক দীর্ঘ পথ চলা বাকি। আমরা এই সত্যকে উপেক্ষা করতে পারি না যে, সমাজের যে ক্ষেত্রটি সমাজের নানা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চায়, সেই ক্ষেত্রটি নিজেই অনেক সময় পিতৃতন্ত্র, বর্ণবাদ, শ্রেণীবাদ এবং আরও নানা কাঠামোগত সমস্যার মধ্যে গভীরভাবে নিমজ্জিত থাকে। আজ সামাজিক ক্ষেত্রটি কোন পথে এগোবে, সেটা অনেকটাই নির্ধারিত হয় তহবিলদাতা এবং তহবিল প্রদানকারী সংস্থাগুলির প্রভাব ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। তবে যারা সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে, তাদের সত্যিকার অর্থে পরিষেবা দিতে চাইলে আমাদের মনে রাখতে হবে—তহবিল কোনো লক্ষ্য নয়; এটি কেবল এগিয়ে যাওয়ার পথকে সাহায্য করার একটি হাতিয়ার মাত্র।অনুভূতি-তে আমরা নিজেদের বারবার মনে করিয়ে দিই যে, কঠোর পরিকাঠামো, প্রজেক্টের ডেডলাইনের চাপ এবং তহবিলদাতাদের চাহিদা যেন আমাদের আসল লক্ষ্যকে ছাপিয়ে না যায়। আমাদের লক্ষ্য হলো জনগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে কাজ করা, এবং একই সঙ্গে একটি নারীবাদীওবর্ণবিরোধী আদর্শকে অনুসরণ করা।

এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI

আরো জানুন

donate banner
We want IDR to be as much yours as it is ours. Tell us what you want to read.
ABOUT THE AUTHORS
দীপা পাওয়ার-Image
দীপা পাওয়ার

দীপা পাওয়ার একজন NT-DNT (যাযাবর ও বিমুক্ত জাতি) সমাজকর্মী, গবেষক, লেখক, প্রশিক্ষক এবং কাউন্সেলর। তিনি ঘিসাদি যাযাবর জনগোষ্ঠীর সদস্য। তাঁর জীবনে অভিবাসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং সমাজে “অপরাধী” হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতাও তিনি বহন করেন। পাশাপাশি, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং বঞ্চনার পরিস্থিতিকেও তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি অনুভূতি নামে একটি বর্ণবিরোধী এবং মহিলা অধিকারভিত্তিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, যা বিভিন্ন পরিচয় ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কাজ করে। দীর্ঘ কর্মজীবনে দীপা যাযাবর ও বিমুক্ত জাতি (NT-DNT), আদিবাসী, গ্রামীণ এবং বহুজন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর কাজের প্রধান ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে—লিঙ্গসমতা, মানসিক ও যৌন স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যবিধি, এবং সংবিধান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি। এছাড়াও, তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ করেন এবং তাঁদের নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুন করে ফিরে পেতে সহায়তা করেন।

COMMENTS
READ NEXT