READ THIS ARTICLE IN


গ্রামীণ রাজস্থানে নিজের মুক্তির পথ তৈরির লড়াই

Location Icon রাজসমন্দ জেলা, রাজস্থান
The image features a group of young people sitting on mattresses in a semi-circle. They are facing an older person who is addressing the group._Social norms
পুরনো প্রথা এবং মানুষের আচরণ পরিবর্তনের একটাই উপায় আছে; আর তা হলো ধৈর্য ধরে দীর্ঘ সময় নিয়ে মানুষকে এর প্রয়োজনীয়তা বোঝানো। | ছবি সৌজন্য: পূজা কুমারী

আমি রাজস্থানের রাজসমন্দ জেলার ভীম তহসিলের অজিতগড় গ্রামের মেয়ে। আমার বড় হওয়াটা সহজ ছিল না। আমার বাবা নিজের সন্তানদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন, কিন্তু আমার মা ছিলেন ভীষণ পরিশ্রমী। সংসার চালানোর জন্য তিনি পাথর ভাঙার মতো কঠিন পরিশ্রমের কাজ করেছেন। 

আমাদের এলাকায় মেয়েদের ক্লাস 10 বা 12-এর পর পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া এবং 18 বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার। আমার ক্ষেত্রেও সবাই এটাই ভেবেছিল, বিশেষ করে আমার পরিবারের অবস্থার কারণে। কিন্তু আমি ঠিক করেছিলাম যে আমি এই পথে হাঁটব না। পরিবার আর সমাজের চাপের কারণে আমাদের মতো তরুণীদের পক্ষে বারবার বিয়ের প্রস্তাব এড়িয়ে যাওয়া বা এর প্রতিবাদ করা খুব কঠিন। এমন গভীরভাবে গেঁথে থাকা প্রথা আর মানসিকতা বদলাতে গেলে সময় নিয়ে ধীরে ধীরে মানুষের ভাবনা বদলাতে হয়। 

সমাজে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে মানুষের পুরনো ধ্যানধারণা বদলানোর জন্য আমি সবসময় নতুন নতুন উপায় খুঁজতাম। স্কুল শেষ করার পর আমি ‘স্কুল ফর ডেমোক্রেসি’ (SFD)-তে পার্ট-টাইম কাজ শুরু করি। সেখানে আমার কাজ ছিল সংবিধানের মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করা। এর মাধ্যমে আমি নিজের গ্রামে একটি লাইব্রেরি চালানোর সুযোগ পাই এবং স্টাইপেন্ড হিসেবে কিছু টাকাও পেতাম। আমার পরিবার বুঝতে পারতো না কেন আমি বিয়ে করে সংসার করার বদলে সংবিধান নিয়ে কাজ করছি। তাঁদের চিন্তা ছিল যে ‘লোকে কী বলবে’।

আমি শুধু মেয়ে হওয়ার জন্যই অবহেলার শিকার হইনি, আমাকে জাতপাতের বৈষম্যও সহ্য করতে হয়েছে। অন্য জাতের বাচ্চারা আমার লাইব্রেরিতে আসতো না। তাদের বাবা-মায়েরা চাইতেন না যে বাচ্চারা কোনো ‘খটিক’ বাড়িতে যাক, কারণ আমাদের নিচু জাত মনে করা হতো। তখন আমি লাইব্রেরির বাইরেই পড়াশোনা, গল্প বলা আর নানা ধরনের সেশন নেওয়া শুরু করি, যাতে আসা-যাওয়ার পথে সবাই দেখতে পায় যে বাচ্চারা কত কিছু শিখছে। 

অল্প সময়ের মধ্যেই বাবা-মায়েরা তাদের বাচ্চাদের লাইব্রেরিতে পাঠাতে শুরু করলেন। এই কাজের মাধ্যমে আমি যে সম্মান পেয়েছিলাম, তা প্রথমে আমার পরিবারের এবং ধীরে ধীরে সমাজের ধ্যানধারণা বদলাতেও সাহায্য করল। মানুষ আমাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করল। 

আমি যখন SFD-তে পাকাপাকিভাবে কাজ শুরু করলাম, মা আবার কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু আমি সবসময় মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখতাম। প্রত্যেকটা ট্রেনিং বা ওয়ার্কশপ শেষ করে আমি মাকে ফোন করতাম। আমি কী কী শিখছি—আমাদের অধিকার নিয়ে, সাম্য নিয়ে, অন্যান্য রাজ্যের মানুষদের গল্প সব কিছু মাকে বলতাম। আমি যে বইগুলো পড়তাম, সেগুলো মাকে দেখাতাম। যখনই পারতাম বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। ধীরে ধীরে মায়ের মনের ভয় কেটে গেল। 

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এল যখন আমি ভোপালের আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেলাম। আমি মাকে সঙ্গে করে ক্যাম্পাস দেখাতে নিয়ে গেছিলাম। আমি চেয়েছিলাম মা নিজে দেখুক আমি কোথায় পড়াশোনা করব, ওখানকার মানুষের সাথে কথা বলুক এবং বুঝুক যে জায়গাটা নিরাপদ। পরে মা আমাকে বলেছিলেন, “তোমার যা করার করো, কিন্তু এমন কিছু কোরো না যাতে আমাকে লজ্জায় মাথা নিচু করতে হয়।” এটা শুনে হয়তো মনে হচ্ছে যে মা খুশি মনে ব্যাপারটা মেনে নেন নি, কিন্তু আমার কাছে এটুকুই ছিল অনেক বড় পাওয়া। কারণ আমার স্বাধীনতার জন্য মা নিজের আত্মীয়-স্বজন, জাতপাতের ভেদাভেদ আর সমাজের মানুষের সাথে লড়াই করেছিলেন।

আমি আমার গ্রামের বন্ধুদের জন্য একটি মেয়েদের হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপ খুলেছি। এরা সবাই খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বা অন্যান্য বাধার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তারা আমাকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা, স্কলারশিপ বা বিভিন্ন কোর্স সম্পর্কে জানতে মেসেজ করে। আমি তাদের সবরকম তথ্য দিয়ে সাহায্য করি। এদের মধ্যে কেউ কেউ ওপেন স্কুল বা মুক্ত বিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করেছে, আর একজন তো একটি অলাভজনক সংস্থায় চাকরিও পেয়েছে। সে এই প্রথম গ্রামের বাইরে পা রাখল। 

তাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি কীভাবে আমার মাকে রাজি করালাম। আমি তাদের বলি, “ছোট ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করো। তোমরা যা শিখছো তা নিয়ে বাড়িতে কথা বলো। বাড়ির কাজে সাহায্য করো। একটু একটু করে টাকা জমিয়ে দরকার হলে বাড়িতে পাঠাও। ঝগড়া করে নয় বরং তোমার কাজের মাধ্যমে দেখাও তুমি কী করতে পারো এবং ধীরে ধীরে বাড়ির লোকেদের মনে বিশ্বাস তৈরি করো।” 

পূজা কুমারী বর্তমানে আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির মাস্টার্সের ছাত্রী। এছাড়াও তিনি ‘অবসর‘ (Avsar) নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত, যারা গ্রামের তরুণ-তরুণীদের শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কাজের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হতে সাহায্য করে।

এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI.

আরও জানুন: এক তরুণীর আর্থিক স্বাধীনতার পথে YouTube কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে, সেই গল্পটি এখানে পড়তে পারেন। 

আরও কী করতে পারেন: পূজার কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে বা তাকে সাহায্য করতে চাইলে, khatikpooja644@gmail.com এই ইমেইল ঠিকানায় যোগাযোগ করুন।

READ NEXT