মুম্বাইয়ের এক কাউন্সিলর এবং নার্সের দৈনন্দিন জীবন, যেখানে তাঁরা বাড়িতে গিয়ে উপশমমূলক সেবা (প্যালিয়েটিভ কেয়ার) প্রদান করেন এবং অসুস্থতা, ক্ষতি আর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কীভাবে মর্যাদার সাথে পথ চলা যায় সেই বিষয়ে রোগী এবং তাঁর পরিবারকে সাহায্য করেন।

Read article in Hindi
9 min read
This is the second article in an 8-part series supported by Ajit Isaac Foundation. It examines the place of palliative care within India’s evolving healthcare landscape, drawing on the insights and experiences of key practitioners working to expand access and awareness. The series seeks to foster a deeper understanding of palliative care and its many dimensions, including dignified end-of-life care, advance care planning, family-centred care, and more within the Indian context.

View the entire series here.


2022 সালে ফুসফুসের ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন ইকবাল,* 35। অসুস্থতার শারীরিক ও মানসিক ধকলের পাশাপাশি তাকে এবং তার পরিবারকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তার স্ত্রী, নীনা,* শীঘ্রই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী এবং তাদের দুই ছোট সন্তানের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এদিকে কোনো উইল না থাকায় ইকবালের রেখে যাওয়া সম্পত্তিও পড়েছিল অনিশ্চয়তার মুখে। এর সাথে, পারিবারিক তিক্ততার কারণে নিজের এই শেষ পরিণতির কথা বাবা-মার কাছ থেকে গোপন রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।

ইকবাল 2023 সালে আমাদের কাছে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমাদের দলে একজন ডাক্তার, দুইজন নার্স এবং একজন কাউন্সিলর ছিলেন, যারা তাকে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যায় তা মূল্যায়ন করতে তার বাড়িতে যান। ডাক্তার তার উপসর্গগুলো পরীক্ষা করে একটি সেবা পরিকল্পনা তৈরি করেন। যেহেতু ইকবাল আংশিকভাবে শয্যাশায়ী ছিলেন, তাই নার্স তাকে ত্বকের যত্ন এবং মুখের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। অন্যদিকে, কাউন্সিলর এই দম্পতির আবেগজনিত প্রয়োজনগুলোর কথা শোনেন, যার মধ্যে ছিল ছোট সন্তানদের কাছে এই দুঃসংবাদ কীভাবে তুলে ধরা যায়, সেই উদ্বেগও। নীনা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন; ইকবাল নিজেও বিষণ্ণতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং ওষুধ খেতে চাইছিলেন না। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি তার বাবা-মাকে জানানোর বিষয়ে রাজি হলেন, তখন তিনি নিজে তা করতে চাননি। তাই, আমরা তার বাবা-মায়ের সাথে চার ঘণ্টা বসে তার শারীরিক অবস্থা ব্যাখ্যা করি, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিই এবং তাদের মনের জটিল আবেগগুলো সামলাতে সাহায্য করি।

আমরা একদিন অন্তর পরিবারটির সাথে দেখা করতাম এবং পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য তাদের চিকিৎসা ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান করতাম। আমরা তাদের এমন একজন আইনি পরামর্শদাতার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিই, যিনি তাদের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করতে পারেন।

What is IDR Answers Page Banner

এটি আমাদের জীবনের একটি দিনের গল্প।

আমরা, শ্রুতি এবং অঙ্কিতা, আমরা মুম্বাইয়ে যথাক্রমে কাউন্সিলর এবং নার্স হিসেবে কাজ করি। আমরা Palcare-এর একটি মেডিকেল টিমের অংশ—জিমি এস বিলামোরিয়া ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগে দূরারোগ্য ও জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের বাড়িতে গিয়ে উপশমমূলক সেবা (প্যালিয়েটিভ কেয়ার) দেওয়া হয়, যাতে তারা ব্যথামুক্ত, আরামদায়ক ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল জীবন কাটাতে পারেন। আমরা শহরে কর্মরত নয়টি দলের মধ্যে একটি এবং আমাদের দল সরাসরি 50-60 জন রোগীর সাথে কাজ করে। আমরা মূলত অনকোলজি বিভাগ থেকে রোগীদের রেফারেল পাই, এছাড়া অনলাইনে এবং পরিচিতদের মাধ্যমেও রেফারেল আসে। আমাদের রোগীদের বেশিরভাগই ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ের রোগী। 

সকাল 7টা

শ্রুতি: আমি সকাল 7টা থেকে 7.30-এর মধ্যে ঘুম থেকে উঠি, সকালের জলখাবার তৈরি করি এবং গোটা দিনের জন্য প্রস্তুত হই। আমি আমার স্বামীর সাথে থাকি। আমি 17 বছর বয়সে মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনার জন্য কলকাতা থেকে মুম্বাইয়ে আসি এবং তারপর থেকে এখানেই আছি। আমার পরিবারের কেউ চিকিৎসা পেশায় নেই, কিন্তু স্কুলে মনোবিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হওয়ার পর থেকেই আমি এটি নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। মানুষের আবেগ ও ব্যক্তিত্বের গভীরতা, বিশেষ করে যখন আমাদের মস্তিষ্ক সংকটের মধ্য দিয়ে যায়, তা আমার কাছে সবসময়ই খুব আকর্ষণীয় ছিল।

2022 সালে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে আমার মাস্টার্স শেষ করার সময়, একজন নিয়োগকারী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সাইকো-অনকোলজি সম্পর্কে বলেন—এটি ক্যান্সার সেবার একটি আন্তঃবিভাগীয় ক্ষেত্র যা রোগীর এবং তাদের পরিবারের মানসিক, আচরণগত ও সামাজিক প্রয়োজনগুলো নিয়ে কাজ করে।

গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে, উপশমমূলক সেবা শুরু থেকেই এবং নিরাময়মূলক চিকিৎসার পাশাপাশি শুরু করা উচিত, কারণ এটি উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যথা ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে।

এই সময়েই আমি উপশমমূলক সেবা সম্পর্কে জানতে পারি। এটি নিয়ে এখনো অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে আমার নিজের পরিবারের উপশমমূলক সেবা সম্পর্কে অনেক ভালো ধারণা তৈরি হয়েছে। আমি যখন প্রথম কাজ শুরু করি, তখন আমার আত্মীয়দের কেউই জানত না এটি কী—তাঁরা আমাকে জিজ্ঞেস করতেন আমি কেন এই ক্ষেত্রে কাজ করতে চাই, কেন আমি এমন মানুষদের কাউন্সেলিং দিতে চাই ‘যারা মারা যাবেন’, এবং কেন আমি এর জন্য অন্যের বাড়িতে যেতে চাই।

donate banner

মানুষ ক্যান্সার বা এই ধরনের অসুস্থতাকে হাসপাতাল বা হসপিসের সাথে যুক্ত করে; এমন একটি ধারণাও আছে যে উপশমমূলক সেবা কেবল জীবনের শেষ সময়ে প্রয়োজন কিন্তু এটি সত্য নয। গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে, উপশমমূলক সেবা শুরু থেকেই এবং নিরাময়মূলক চিকিৎসার পাশাপাশি শুরু করা উচিত, কারণ এটি উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যথা ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে এবং রোগী ও পরিবারকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। 

তবে, একটি দুরারোগ্য রোগ, আক্রান্ত রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে তীব্র ও জটিল মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। যখন চিকিৎসা নিরাময়যোগ্য হয়, তখন কথোপকথনগুলো আশাব্যঞ্জক হয়, যা মানুষকে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন একজন রোগীর হাতে মাত্র এক মাস বা এক বছর সময় থাকে, তখন কী করবেন? এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে আপনি কীভাবে তাঁদের ও তাঁদের পরিবারকে সহায়তা করবেন?

এই কথোপকথনগুলোই আমরা প্রতিদিন করি। প্রতিদিন সকালে, অঙ্কিতা এবং আমি সকাল 9টা থেকে 9.30-এর মধ্যে একটি ট্রেন স্টেশনে দেখা করি এবং রোগীদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সফর শুরু করি।

অঙ্কিতা: আমি সকাল 7টার দিকে ঘুম থেকে উঠি এবং গোটা দিনের জন্য প্রস্তুত হই। আমি আমার পরিবারের সাথে থাকি। আমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত, মা গৃহিণী এবং বোন একজন হিসাবরক্ষক। দ্বাদশ শ্রেণী শেষ করার পর, আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি চিকিৎসা ক্ষেত্রে পড়াশোনা করতে চাই। কিন্তু আমি ডাক্তার হব নাকি নার্স, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। আমার দুই আত্মীয় নার্স, তাই মা আমাকে একই পেশা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

আমি দুই বছর হাসপাতালে কাজ করেছি। কোভিড-19 মহামারীর সময়, আমার এক বন্ধু আমাকে উপশমমূলক সেবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। Palcare-এ যোগ দেওয়ার পর, আমি উপশমমূলক সেবার নির্দিষ্ট কৌশলগুলো শেখার জন্য অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। আমাদের কাজ শুধু চিকিৎসা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে আন্তরিকভাবে পাশে থাকা বা যত্ন নেওয়াটাও মূল বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে সহমর্মিতা ও নিষ্ঠার সাথে যোগাযোগ করা; বেড সোর, বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা এবং লিম্ফেডেমার মতো সাধারণ উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ করা; এবং প্রধান যত্ন প্রদানকারীকে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে উপশমমূলক সেবায় কাজ করার পর, আজ আমি আমার সিদ্ধান্তে আনন্দিত। মানুষের যত্ন নেওয়া এবং তাঁদের স্বস্তি প্রদান করা আমাকে অবিশ্বাস্য আনন্দ দেয়।

সকালে তৈরি হওয়ার পর, আমি সকাল 9টার মধ্যে শ্রুতির সাথে দেখা করতে বেরিয়ে পড়ি।

a group of women sitting on the floor and smiling at the camera--palliative care
এমনকি রোগীরা সুস্থ হতে শুরু করলেও, আমরা তাঁদের সাথে অন্তত এক থেকে দুই বছর যোগাযোগ বজায় রাখি যাতে রোগমুক্তি বা অন্য কোনো জটিলতা পরীক্ষা করা যায়। | ছবি সৌজন্যে: Palcare

সকাল 9টা

শ্রুতি এবং অঙ্কিতা: এক একটা দিন এক এক রকম। যেহেতু প্রতিটি রোগীর সাথে প্রতিদিন দেখা করা সম্ভব নয় এবং সবসময় প্রয়োজনও হয় না, তাই আমরা তাঁদের শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আমরা রোগীদের ‘কম’, ‘মাঝারি’ ও ‘জরুরি’ (উচ্চ), এই তিন বিভাগে ভাগ করে আমাদের দৈনিক যাতায়াতের সময়সূচি বানাই। আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন প্রয়োজন মূল্যায়ন করে এই সিদ্ধান্ত নিই, বিষয়টিকে নমনীয় রাখি এবং রোগী ও পরিবারের চাহিদার কথা মাথায় রাখি। উদাহরণস্বরূপ, কোনো রোগী শারীরিকভাবে ভালো থাকলেও, তাঁর বা তাঁর পরিবারের মানসিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, যার ফলে শারীরিক উপসর্গের দিক থেকে তাঁরা নিম্ন অগ্রাধিকারভুক্ত হলেও তাঁদের ফলো-আপের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে, শ্রুতি তাঁদের সাথে বেশি দেখা করবেন, অন্যদিকে যে রোগীর শারীরিক উপসর্গ ব্যবস্থাপনায় সাহায্যের প্রয়োজন, সেখানে অঙ্কিতাই মূল ভূমিকা নেন।

সেবা শুরু করার দিন অর্থাৎ প্রথম পরিদর্শনের কাজটিই থাকে সবচেয়ে নিবিড় ও বিস্তৃত। এই সময়ে আমরা রোগীর চিকিৎসার পূর্ব ইতিহাস রেকর্ড করি এবং ডাক্তার, নার্স ও কাউন্সিলর প্রত্যেকে পরিবারকে নিজেদের ভূমিকা বুঝিয়ে বলি। আমরা বিস্তারিত তুলে ধরি যে গৃহকেন্দ্রিক উপশমমূলক সেবা আসলে কী—কীভাবে এই সেবা মূল চিকিৎসার পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চলতে থাকে, রোগের কষ্ট উপসর্গের বোঝা কীভাবে কমানো যায় এবং কাউন্সেলিংয়ের ধরণটি কেমন হয়।

কোনো রোগী যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছান, তবে কীভাবে তাঁকে সেরা উপায়ে সেবা প্রদান করা যায়—সে বিষয়ে আমরা রোগী ও তাঁর পরিবারকে প্রস্তুত করি। রোগী অসহ্য যন্ত্রণায় কষ্ট পেলে মরফিনের মতো ওপিঅয়েড ব্যথানাশক ওষুধের গুরুত্ব ও নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে পরিবারকে ধারণা দিই। এর মধ্যে তাঁদের মনে থাকা যেকোনো ভয় বা দ্বিধা দূর করা এবং শুরুতে কিছুটা ঘুম-ঘুম ভাব বা তন্দ্রাচ্ছন্নতার মতো সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলাও অন্তর্ভুক্ত।

যেসব পরিবারে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, আমরা তাদের অন্যান্য অলাভজনক সংস্থার সাথেও যোগাযোগ করিয়ে দিই।

আমরা নিয়মিত আমাদের রোগীদের এবং তাঁদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখি এবং দলকে আপডেট রাখি। এমনকি রোগীরা সুস্থ হতে শুরু করলেও, আমরা তাঁদের সাথে অন্তত এক থেকে দুই বছর যোগাযোগ রাখি যাতে রোগমুক্তি বা অন্য কোনো জটিলতা পরীক্ষা করা যায়।

প্রতি সোমবারে আমাদের পুরো দল একসঙ্গে বসে কোনো রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো উদ্বেগ বা জটিলতা তৈরি হলো কি না তা নিয়ে আলোচনা করি, প্রত্যেকের অগ্রাধিকারের মাত্রা পুনর্বিবেচনা করি এবং পুরো সপ্তাহের কাজের ছক সাজিয়ে নিই।

শ্রুতি: যদিও আমাদের দলের প্রতিটি সদস্যের আলাদা ভূমিকা রয়েছে, তবুও রোগীর অসুস্থতার গতিপথ বোঝার জন্য একে অপরের সাথে, রোগীর পরিবারের সাথে এবং প্রধান ডাক্তারের সাথে নিয়মিত সমন্বয় রাখাটা ভীষণ জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, লিভার ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ের রোগীদের হ্যালুসিনেশন হওয়া সাধারণ। আমি যদি রোগের অগ্রগতি সম্পর্কে সচেতন না থাকি, তবে আমি রোগের উপসর্গগুলোকে সাইকোসিস বলে ভুল করতে পারি—যা একটি ভুল বিশ্লেষণ হবে।

অঙ্কিতা: রোগী এবং তার পরিবার উভয়ের প্রতিই আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, আর প্রায়শই এই দুপক্ষের চাহিদার মাঝে আমাদের ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়। এটি বিশেষ করে সেসব ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে রোগী নিজের অসুস্থতা বা এর চূড়ান্ত পরিণতির পুরোটা জানেন না। রোগীর বাড়িতে প্রথমবার যাওয়ার আগেই আমরা সেবাদানকারীদের কাছ থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নিই। পরিবারগুলো অনেক সময়ই রোগীকে অতিরিক্ত কষ্ট ও মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে আড়াল করতে পরিস্থিতির বিস্তারিত জানাতে চায় না। অনেক সময় এটি তাঁদের নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার বা পরিস্থিতি সামলানোর একটি পথও বটে। আমাদের কাজ তাঁদের সিদ্ধান্তের কোনো বিচার-বিশ্লেষণ বা সমালোচনা করা নয়, বরং পরম যত্নে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

শ্রুতি: আমরা যদিও পুরো পরিবারের সাথে কাজ করি, তবুও রোগীর নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া বা মতামত প্রকাশকে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। রোগীর ক্ষেত্রে আমরা ‘জিজ্ঞাসা করো-বলো-জিজ্ঞাসা করো’ পদ্ধতি মেনে চলি: প্রথমে জানা যে তিনি নিজের রোগ সম্পর্কে আগে থেকে কতটুকু জানেন এবং আর কতটুকু জানতে চান; সেই বুঝে তাঁকে তথ্য দেওয়া; এবং সবশেষে তিনি বিষয়টি ঠিক কতখানি বুঝতে পারলেন ও তাঁর মানসিক প্রতিক্রিয়া কেমন, তা অনুধাবন করা। এতে আলোচনাটি পুরোপুরি রোগী-কেন্দ্রিক ও মানবিক আবেদনপূর্ণ থাকে।

মরণব্যাধিতে আক্রান্ত প্রিয়জনকে হারানোর তীব্র শোক ও মানসিক যন্ত্রণা সামলে ওঠার জন্য পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় মানসিক শক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দেখা একটি কেসে, 50 বছর বয়সী এক ব্যক্তি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু তাঁর পরিবারের মানুষেরা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে ডায়াবেটিসের জটিলতার কারণেই তাঁর মুখে এই দীর্ঘস্থায়ী আলসার বা ক্ষত হয়েছে। তাঁদের ভয় ছিল, আসল সত্যটা জানতে পারলে তিনি মনোবল হারিয়ে ফেলবেন এবং মানসিক আঘাতে ‘দ্রুত মারা যাবেন’। এমনকি তাঁর চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তারও রোগীকে আসল রোগ নির্ণয়ের কথা জানাননি। আমাদের পরিদর্শনের সময়ে রোগী প্রায়শই চরম হতাশা প্রকাশ করতেন এবং প্রশ্ন তুলতেন—এত চিকিৎসা ও একরাশ ওষুধ খাওয়ার পরেও কেন তাঁর মুখের এই ক্ষত কিছুতেই সারছে না! এই পরিস্থিতিতে আমরা পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সাথে আলাদা করে কথা বলি এবং জানার চেষ্টা করি যে, রোগীকে সত্যিটা জানানো হলে ঠিক কী ঘটবে বলে তাঁরা মনে করছেন।

প্রায়ই, পরিবারগুলো জানে না যে সত্য প্রকাশের পরবর্তী পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হয়। তাঁরা তাঁদের চাকরি, পারিবারিক জীবন এবং সেবা প্রদানের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে দিশেহারা বোধ করতে পারেন। যদি অসুস্থতার পাশাপাশি রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, তবে তাঁরা তা সামলানোর জন্য প্রস্তুত বোধ করে না। এমন পরিস্থিতিতে, আমাদের কাজ হলো পরিবারকে অসুস্থতা সম্পর্কে তথ্য প্রক্রিয়াকরণে সাহায্য করা এবং তা রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।  

আমরা এই রূপক বা উদাহরণটি প্রায়ই ব্যবহার করি: ধরুন, আপনি হঠাৎ করেই নিজেকে একটি বক্সিং রিংয়ে দেখতে পেলেন, যেখানে নামার ব্যাপারে আগে থেকে আপনি কিছুই জানতেন না। এবার ভেবে দেখুন, প্রতিপক্ষের প্রথম ঘুষি বা আঘাতটা আপনার জন্য কতটা অভাবনীয় হবে এবং সেটির জন্য আপনি কতটা অপ্রস্তুত থাকবেন।  

যদি কোনো ব্যক্তি জানেন যে তিনি মারা যাচ্ছেন, তবে তিনি হয়তো তার জন্য প্রস্তুতি নিতে চাইবেন—অনেক দিন দেখা হয়নি এমন বন্ধুদের সাথে দেখা করা, পুরনো তিক্ততা ভুলে সম্পর্কগুলো জোড়া লাগানো, বন্ধু ও পরিবারের জন্য কিছু রেখে যাওয়া। এই সবকিছুর জন্য সময় প্রয়োজন, তা যতই সীমিত হোক না কেন।

দীর্ঘদিন রোগে ভোগা প্রিয়জনকে হারানোর পর সেই গভীর শোক ও শূন্যতা সামলে ওঠার জন্য পরিবারকে প্রয়োজনীয় মানসিক শক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার সংস্থান করে দেওয়া ভীষণ জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে আমরা স্বজনদের কাছে অন্তত তিনবার শোক প্রকাশ ও সমবেদনা জ্ঞাপনে যাই, যাতে তাঁদের বর্তমান মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝা যায় এবং তারা এই বড় ধাক্কা সামলে উঠতে পারছেন কি না, নাকি তাঁদের মধ্যে জটিল বা দীর্ঘস্থায়ী শোক (complicated grief) বাসা বাঁধছে তা বোঝা যায়। আমরা তাঁদের আবেগ ও অনুভূতিগুলো খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে হালকা করার চেষ্টা করি এবং প্রয়োজন মনে করলে অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিই।

a woman in jeans and kurta holding the hand of another woman wearing a saree--palliative care
রোগী এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে এবং আমাদের প্রায়ই উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। | ছবি সৌজন্যে: Palcare

দুপুর 1টা

শ্রুতি এবং অঙ্কিতা: রোগী ও তাঁদের পরিবারের অবস্থার ওপর নির্ভর করে, প্রতি বাড়িতে পরিদর্শনের জন্য আমাদের এক থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। আমরা দিনে তিন থেকে পাঁচটি পরিদর্শন করি এবং এর মাঝে দুপুরের খাবারের জন্য অল্প সময় বের করে নিই। সাধারণত এই সময়ে আমরা একে অপরের সাথে আলোচনা করি এবং মানসিকভাবে কঠিন বা জটিল পরিস্থিতিগুলো কে কীভাবে সামলাচ্ছি, তা ভাগ করে নিই। আমরা কি বার্নআউট বা উদ্বেগের শিকার হচ্ছি? আমরা কি কোনো কেস দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত? যদি আমাদের মানসিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, তবে Palcare-এ একজন মনোবিজ্ঞানী রয়েছেন। সহকর্মীদের পারস্পরিক সহানুভূতি, মন খুলে কথা বলা, নিয়মিত মিটিং, একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো এবং নিজস্ব আত্ম পরিচর্যার মাধ্যমে আমরা কাজের মানসিক ক্লান্তি সামলে নিই—যাতে অতিরিক্ত মানসিক চাপে ভারাক্রান্ত না হয়েও প্রতিনিয়ত পরম সহমর্মিতার সাথে এই সেবা প্রদান করে যেতে পারি।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা উপশমমূলক সেবা সম্পর্কিত নতুন বিষয় এবং সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানার জন্য আমরা প্রতি বুধবার সমস্ত জোনাল টিমের সাথে সেশনে বসি। আর প্রতি বৃহস্পতিবার, আমরা কঠিন কেসগুলো নিয়ে আলোচনা করতে এবং একে অপরের কাছ থেকে শিখতে মিটিং করি।

বাড়িতে ভিজিট এবং অনলাইন মিটিংয়ের মাঝে, আমাদের নিয়মিত অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। আমরা মূলত নথিপত্র গোছাতে বা রোগীদের বিনামূল্যে যে ওষুধগুলো দিই, সেগুলো সংগ্রহ করতে অফিসে যাই।

a large group of women sitting in the waiting room of the Palcare office--palliative care
প্রতি বৃহস্পতিবার, আমরা কঠিন কেসগুলো নিয়ে আলোচনা করতে এবং একে অপরের কাছ থেকে শিখতে মিটিং করি। | ছবি সৌজন্যে: Palcare

বিকাল 6.30টা

শ্রুতি এবং অঙ্কিতা: আমরা বিকাল 5.30টার মধ্যে কাজ গুটিয়ে ফেলি। বাড়ি ফেরার পর, আমরা সারাদিনের কেসের বিস্তারিত তথ্য এবং আপডেটগুলো একটি সফটওয়্যারে প্রবেশ করাই।

শ্রুতি: আমার কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস আছে যা আমাকে চাপমুক্ত হতে সাহায্য করে। বাড়ি ফেরার পর, আমি স্নান করি এবং কল্পনা করি যে সারাদিনের উদ্বেগ ও কষ্টগুলো ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। তারপর, আমি একটু ঘুমিয়ে নিই যাতে আমার ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনের মধ্যে একটি বিরতি থাকে। যদি দিনটি খুব বেশি চাপের হয়, তবে আমি আমার স্বামী বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের সাথে তা ভাগ করে নিই।

আমি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে, মন্ডলা আঁকতে এবং মনের প্রশান্তি অর্জনের জন্য ডায়েরি লিখতে ভালোবাসি।

অঙ্কিতা: বাড়ি ফেরার পর আমি স্নান করি এবং একটু ঘুমিয়ে নিই। আমি রান্না এবং অন্যান্য ঘরের কাজে আমার মাকে সাহায্য করি। মাঝে মাঝে, আমি মায়ের সাথে কেনাকাটা করতে যাই, যা আমাদের একসাথে কিছু ভালো সময় কাটানোর সুযোগ করে দেয়। আমি আমার সারাদিনের ঘটনাগুলো তাঁর সাথে শেয়ার করি, কারণ এটি আমাকে স্বস্তি দেয় এবং আমাদের সম্পর্ককে আরও মজবুত করে। আমি প্রায়ই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুর সাথে কথা বলি, যা আমাকে শিথিল হতে সাহায্য করে। রাতের খাবার খাওয়ার পর, আমি ফোনে কিছুক্ষণ ওয়েব সিরিজ দেখি এবং তারপর ঘুমোতে যাই।

তবে, আমি প্রায়ই রাতের অদ্ভুত সময়ে ফোন পাই। যদি কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হয় বা কোনো সেবাপ্রদানকারীকে অপ্রত্যাশিতভাবে ওষুধ দিতে হয়, তবে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন। প্রয়োজনে আমি ভিডিও কলে তাঁদের সাথে কথা বলি বা তাঁদের স্থানীয় ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিই। পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে, আমি পরিবারকে আশ্বস্ত করি যে আমরা পরের দিন তাঁদের সাথে দেখা করতে যাব।

উপশমমূলক সেবা প্রদানকারী হিসেবে, আমাদের মূল দায়িত্ব হলো রোগী ও তাঁদের পরিবারকে রোগযন্ত্রণা, প্রিয়জনকে হারানোর ভয় ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে সাহায্য করা, যাতে তাঁরা মর্যাদা ও সঠিক মানসিক সমর্থন খুঁজে পান। আর এই ধরণের নিবিড় সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজন প্রভূত সময় এবং পারস্পরিক গভীর আস্থা।

*গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য নাম পরিবর্তন করা হয়েছে ।

ছবি সৌজন্যে: ফ্রাঁসোয়া দেকালে Flickr/CC BY সূত্রে প্রাপ্ত ।

এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI । 

—

আরও জানুন

  • গুরুতর অসুস্থ রোগীদের উপসর্গ ব্যবস্থাপনা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে উপশমমূলক সেবার গুরুত্ব বুঝুন।
  • উপশমমূলক সেবায় রোগীদের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা সম্পর্কে আরও জানুন। 
  • মরণব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের পারিবারিক কেয়ারগিভারদের চ্যালেঞ্জ এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে পড়ুন।
donate banner
We want IDR to be as much yours as it is ours. Tell us what you want to read.
ABOUT THE AUTHORS
অঙ্কিতা অরবিন্দ মাত্রে-Image
অঙ্কিতা অরবিন্দ মাত্রে

অঙ্কিতা মাত্রে হলেন Palcare-এর একজন নার্সিং পেশাজীবী। তিনি এর আগে গ্লেনিগেলস গ্লোবাল হসপিটাল, এস আর মেহেতা কার্ডিয়াক ইন্সটিটিউট এবং একটি COVID-19 কেয়ার সেন্টারে কাজ করেছেন। অঙ্কিতা মুম্বাইয়ের শন (Sion) হসপিটাল থেকে নার্সিং ডিপ্লোমা করেছেন এবং টাটা মেমোরিয়াল হসপিটাল ও একাডেমি অফ প্যালিয়েটিভ কেয়ার থেকে সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেছেন।

শ্রুতি মুখোপাধ্যায়-Image
শ্রুতি মুখোপাধ্যায়

শ্রুতি মুখোপাধ্যায় হলেন Palcare-এর একজন সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর, যেখানে তিনি প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মানসিক চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্য দিয়ে যাওয়া রোগী ও তাঁদের পরিবারকে সহায়তা করেন। Palcare-এ যোগ দেওয়ার আগে, তিনি মুম্বাই জুড়ে সরকারি হাসপাতালের অনকোলজি ওয়ার্ডে রোগীদের সাথে কাজ করেছেন। শ্রুতি SNDT ইউমেন্স ইউনিভারসিটি থেকে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

COMMENTS
READ NEXT