ভাষা ও ক্ষমতা থেকে শুরু করে প্রবেশাধিকার ও কর্তৃত্ব— ভারতের সামাজিক উন্নয়নমূলক সম্মেলনগুলি থেকে বাদ পড়ে যান বহু মানুষ। কেন আমাদের এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করা দরকার, তা এখানে ব্যাখ্যা করা হলো।

Read article in Hindi
6 min read

“আমি আমাদের গ্রাম থেকে দিল্লি পর্যন্ত এত দূর এসেছি এই সম্মেলনে যোগ দিতে। আমাদের সংগঠনটি ছোট এবং ফান্ডের পরিমাণ সীমিত, তাই তারা কোনোমতে শুধু আমাকেই পাঠাতে পেরেছে। আমাদের আশা ছিল যে এখানে আমার এমন কিছু মানুষের সাথে দেখা হবে যারা আমাদের কাজকে সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু এক সেশন থেকে আরেক সেশনের মাঝে কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলার সময়ই নেই। আবার যখন একটু সুযোগ মেলে, তখন দেখি সবাই আগেই নিজেরা দলে ভাগ হয়ে গেছে। মনে হয়, সবাই সবাইকে চেনে, আর আমি তাদের কাছে যাওয়ার সাহস পাই নি। আমি ইংরেজিতেও খুব একটা সাবলীল নই, আর এখানে সবাই ইংরেজিতে কথা বলে। আমি ভাবতে থাকি, এখানে কেউ আমাকে বুঝবে কিনা, বা কেউ আমার কথা শুনতে চাইবে কিনা। আমার খুবই চিন্তা হয়। আমি ফিরে গিয়ে কী বলব?”

এটি ছিল 2025 সালের আগস্ট মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারতের অন্যতম বড় সামাজিক উন্নয়নমূলক সম্মেলনে, তৃণমূল স্তরের একটি অলাভজনক সংস্থার প্রোজেক্ট কোর্ডিনেটরের সাথে উন্নয়নের কথোপকথন।

এই ধরনের অভিজ্ঞতাগুলি ব্যতিক্রমী নয়। আজ সমগ্র উন্নয়ন ক্ষেত্রে সমাজসেবা, সুশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, জল ও স্যানিটেশন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, নারী ও শিশু অধিকার, প্রতিবন্ধী অধিকার এবং নাগরিক সক্রিয়তার মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত অজস্র অনুষ্ঠান ও সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে—এই সামাজিক ক্ষেত্রটি যে সমস্ত বিষয় নিয়ে কাজ করে, তার প্রায় সবকটি নিয়েই চর্চা হয় সম্মেলনগুলিতে।

What is IDR Answers Page Banner

মূলত, এই স্থানগুলি শিক্ষা ও চিন্তাভাবনার বিকাশ, সংযোগ তৈরি এবং বিভিন্ন স্তরের অনুশীলনকারীদের জন্য মূল্যবান কিছু তৈরি করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে, আর এই উদ্দেশ্যেই দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ অনেক কষ্ট করে ছুটে আসেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই সম্মেলনগুলি সেই মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে প্রায়শই ব্যর্থ হয়।

আলোচনা সভায় প্রায়শই ফান্ডার (তহবিল সরবরাহকারী) এবং বড় বড় অলাভজনক সংস্থাগুলি প্রাধান্য পায়; অধিবেশনগুলি সম্মিলিত শিক্ষার চেয়ে সাংগঠনিক সাফল্য প্রদর্শনের উপর বেশি মনোনিবেশ করে। নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য দশ মিনিটের বিরতি বরাদ্দ করা হয় আর সেখানে কথাবার্তার প্রায় পুরোটাই একচেটিয়া ইংরেজিতে চলে।

এর ফলাফল কী? একটি বিশাল এবং উদ্বেগজনক ব্যবধান। এই সামাজিক ক্ষেত্রটি যে সমস্ত আদর্শের কথা বলে—যেমন অন্তর্ভুক্তিকরণ, সমতা এবং প্রতিনিধিত্ব—তার সাথে এই সম্মেলনগুলির বাস্তব চিত্রের কোনো মিল থাকে না। কে কার হয়ে কথা বলবে, কারা আক্ষরিক অর্থে এই আলোচনায় অংশ নিতে পারবে, কারা নিজেদের এখানে স্বাগত এবং সম্মানিত বোধ করবে, কাকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তারা নিজেদের মতামত প্রকাশের জন্য কতটা জায়গা বা সুযোগ পাবে—এগুলি তাদের ভাষার ওপর, তারা কোন শহর বা মফস্বল থেকে আসছে, ক্ষমতার কোন পদে তারা আসীন রয়েছে এবং আগে থেকেই তারা কোন চেনা প্রভাবশালী মহলের সাথে যুক্ত, তার ওপর নির্ধারিত হয়।

ক্ষমতার খেলা

কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়া; এই বিষয়গুলি কিন্তু সচরাচর দ্বিমুখী (বাইনারি) হয় না; এগুলি কাজ করে দৃশ্যমানতা, সুযোগ এবং কর্তৃত্বের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে। তাত্ত্বিকভাবে, এই ধরনের সম্মেলনগুলি আসলে সমাজের এই ভেদাভেদ মুছে ফেলার একটা বড় মাধ্যম। কারণ, এখানে বিভিন্ন পটভূমির মানুষদের একটি যৌথ স্থানে একত্রিত করা হয়, সবাইকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয় এবং এমন এক আলাপচারিতার সুযোগ তৈরি করা হয় যা হয়তো অন্য কোথাও কোনোদিন সম্ভব হতো না।

বাস্তবে, তবে, এই স্থানগুলি একেবারেই নিরপেক্ষ নয়। উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ দূর করা তো অনেক দূরের কথা, এই সম্মেলনগুলি উল্টে সেই ফাটলগুলিকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে। সেখানে কারা অনবরত কথা বলে যাচ্ছেন আর কারা শুধু শ্রোতা হয়ে বসে আছেন, কারা পুরো সভাকক্ষে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর কারা এক কোণে গুটিয়ে রয়েছেন—এই চেনা ছবিগুলোই বারবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে এই জায়গাগুলি কতটা অসম হতে পারে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিদ্যমান ভৌগোলিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পটভূমি, সাংগঠনিক পরিচিতি, পদমর্যাদা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভাষার কারণে সৃষ্ট ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এই বৈষম্যগুলিকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

donate banner

কাগজে-কলমে সবাই হয়তো একই ছাদের নিচে, একই সভাকক্ষে এসে উপস্থিত হন; কিন্তু সেখানে প্রবেশের সময় সবার অধিকার, আত্মবিশ্বাস কিংবা নিজের কথা শোনানোর মতো ক্ষমতা সমান হয় না। ফলস্বরূপ, যা সকলের জন্য সমান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়, তা প্রায়শই এমন একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করে যেখানে টাকা-পয়সা, ভাষা, স্থান, জাতপাত এবং সামাজিক শ্রেণীর মতো বিদ্যমান বৈষম্যগুলিকে প্রশ্ন করার বা ভাঙার বদলে, সেগুলিকে আরও একবার চর্চা করা হয় এবং সিলমোহর দেওয়া হয়।

এই বর্জনগুলি কীভাবে প্রকাশ পায় তা এখানে দেওয়া হলো:

1. কে কথা বলার সুযোগ পায়

যখন মহিলা কৃষকদের স্বীকৃতির অভাব নিয়ে আয়োজিত কোনো প্যানেল আলোচনায় কেবল পুরুষদেরই মঞ্চে বসানো হয়, তখন এটি শুধু দুর্বল পরিকল্পনার পরিচয় দেয় না, বরং এটি সক্রিয়ভাবে সভাকক্ষে উপস্থিত মহিলা কৃষকদের বিচ্ছিন্ন করে তোলে এবং তাদের মনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য তাদের ওপর ভরসা করা যায় না কেন? একইভাবে, যখন একজন পুরুষ কৃষক একটি অলাভজনক সংস্থার প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ কীভাবে তার ফলন বাড়িয়েছে তা বর্ণনা করার জন্য আমন্ত্রিত হন, তখন তার কয়েক দশকের কৃষিকাজের জ্ঞানকে বিশেষজ্ঞের জ্ঞান হিসেবে গণ্য না করে তাকে স্রেফ একটা গল্প বা টুকরো অভিজ্ঞতা হিসেবেই দেখা হয়। এই দুটি বাস্তব উদাহরণ আমরা দুটি ভিন্ন সম্মেলনে দেখেছি।

সংস্থাগুলির মধ্যে, প্রায়শই দেখা যায় যে সম্মেলনগুলিতে যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিরা হলেন কোঅর্ডিনেটর বা সমন্বয়কারী, যাদের অভিজাত স্থানগুলিতে স্বচ্ছন্দ মনে করা হয়।

যখন সম্মেলনগুলি বারবার একই ধরনের ‘বিশেষজ্ঞদের’ প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরে—যারা মূলত ইংরেজি জানা, সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের উচ্চশ্রেণীর মানুষ এবং যারা ‘প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নের’ জন্য নানারকম প্রকল্প ও পরিকল্পনা তৈরি এবং তা বাস্তবায়ন করেন—তখন তারা আসলে সমাজের বুকে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠায় যে কার জ্ঞানকে বৈধ, সঠিক বা গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করা হবে।

এই পছন্দগুলি সাধারণত হঠাৎ করে হয় না। সংগঠনগুলির মধ্যে, প্রায়শই এমন প্রোগ্রাম ম্যানেজার বা কোঅর্ডিনেটরদের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয় যাদের স্পষ্টবাদী এবং অভিজাত স্থানে স্বচ্ছন্দ বলে মনে করা হয়, অন্যদিকে প্রথম সারির কর্মীরা এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষেরা এই ধরনের সম্মেলগুলি থেকে ব্রাত্যই থেকে যান। তৃণমূল পর্যায়ের বাস্তব সমস্যা নিয়ে আলোচনা প্রায়শই এমন বক্তাদের দ্বারা পরিচালিত হয় যাদের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদের প্রতিদিনের সমস্যার সম্পর্কে জ্ঞান একেবারেই যৎসামান্য। এই শ্রেণিবিভেদ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা আলোচনা সভায় যোগ দেন—অন্যদের সরিয়ে দিয়ে তাকে আগে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়, ফলে সভা বিঘ্নিত হয়।

এই ধরনের অভ্যাস আসলে অংশগ্রহণকারীদের দুটি স্পষ্ট ভাগে ভাগ করে দেয়—একদল যারা নির্দেশ দেয়, আর অন্যদল যাদের থেকে শুধু শেখার বা আদেশ মেনে চলার আশা করা হয়। যখন স্থানীয় সাধারণ মানুষদের মঞ্চে ডেকে আনা হয় শুধুমাত্র তাদের জীবন কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তা সংক্ষেপে আঞ্চলিক ভাষায় বলার জন্য, এবং সেইটুকু শেষ হতেই যখন মূল আলোচনার জন্য আবার ইংরেজিতে ফিরে যাওয়া হয়, তখনই বোঝা যায় তাদের ভূমিকা ঠিক কতটা সীমিত। তাদেরকে সেখানে জ্ঞানের অংশীদার বা অবদানকারী হিসেবে দেখা হয় না, বরং তাদের প্রকল্প বা কাজের সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অংশগ্রহণকারীর বদলে কেবল আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে বিবেচিত হওয়ায়, তাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে বৈধতা দেয়, নতুন রূপ দেয় না।

a man's shadow on a yellow wall--social sector conferences
উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ দূর করা তো অনেক দূরের কথা, এই সম্মেলনগুলি উল্টে সেই ফাটলগুলিকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে। | ছবি সৌজন্যে: Pexels

2. কারা অংশগ্রহণ করতে পারে—এবং কীভাবে

কাগজে-কলমে কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, একটি সম্মেলনের মূল পরিকাঠামো বা নকশাই অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় যে সেখানে কে কতটা অর্থপূর্ণভাবে অংশ নিতে পারবে।

ভাষা: ইংরেজির প্রাধান্য শুধুমাত্র একটি যোগাযোগের বাধা হিসাবে কাজ করে না, এটি মর্যাদা এবং কর্তৃত্বের একটি সূচক হিসাবেও কাজ করে। আজকাল সম্মেলনগুলিতে তৃণমূল স্তরের বা স্থানীয় সামাজিক সংস্থাগুলির প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রবণতা বাড়লেও, অনেক অংশগ্রহণকারী আমাদের জানিয়েছেন যে তারা এই ইভেন্টগুলিতে উদ্বিগ্ন এবং ভীত বোধ করেন। তারা আলোচনা সম্পূর্ণরূপে বুঝতে না পারা বা সাবলীলভাবে ইংরেজিতে উত্তর দিতে না পারার বিষয়ে চিন্তা করে। এর ফলে প্রায়শই তাদের মনে এক ধরনের অপরাধবোধ, তীব্র ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়, এই মানুষগুলি নিজের অজান্তেই নিজেদের বছরের পর বছর ধরে অর্জন করা বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার যোগ্যতা বা বৈধতা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেন।

স্থানএবংখরচ: অধিকাংশ সম্মেলনই মহানগরীগুলিতে অনুষ্ঠিত হয়, যার ফলে অনেক তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনের পক্ষেই আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই সম্মেলনগুলিতে যোগ দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না, বিশেষ করে যদি তারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। এমনকি যাতায়াত এবং থাকার খরচ বহন করা হলেও, এর পেছনের অদৃশ্য খরচগুলি প্রায়শই হিসাব করা হয় না—যেমন, ফেলে আসা ঘর-সংসার বা সন্তান দেখভালের গুরুদায়িত্ব, ভাষাগত সহায়তার অভাব এবং সম্পূর্ণ এক অচেনা-অপরিচিত শহুরে পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার তীব্র শারীরিক ও মানসিক ধকল

সময়: একটি অনুষ্ঠানের সময়কে ঠিক কীভাবে ভাগ করা হচ্ছে, তাও কিন্তু পরোক্ষভাবে নির্ধারণ করে দেয় যে কার কথা শোনা হবে আর কার কথা চাপা পড়ে থাকবে। সুপরিচিত প্যানেলিস্টদের প্রায়শই তাদের নির্ধারিত সময়ের বেশি কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়, কারণ তারা তাদের উদ্যোগের বিবরণ দেন, অন্যদিকে লোকদেখিয়ে যে তৃণমূল স্তরের নেতা বা স্থানীয় প্রতিনিধিকে মঞ্চে নিয়ে আসা হয় তার কাছে কেবল একটি নির্দিষ্ট এবং আগে থেকে ছকে রাখা ভূমিকা পালনেরই আশা করা হয়, যা ইভেন্ট হোস্টের অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং চিন্তাশীল হওয়ার একটা মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

সভাকক্ষে উপস্থিত সাধারণ শ্রোতাদের তাড়াহুড়ো করে প্রশ্ন শেষ করতে বাধ্য করা হয়, এবং তাদের নিজেদের কাজ বা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে সবসময় নিরুৎসাহিতই করা হয়। এর ফলে এই সম্মেলনগুলির একটি পারস্পরিক আলোচনার উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠার যে সুযোগ ছিল, তা থেকে বহুদূরে সরে যায়। একটি অনুষ্ঠানে, রাজ্য স্তরের দলগুলিকে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল একেবারে শেষ দিনে। যখন তারা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিলেন যে গত দুদিন ধরে যে সমস্ত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা আদতে ফান্ডিং সংস্থার ম্যান্ডেট অনুযায়ী বাস্তবে রূপায়ণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়—ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কারণ, সম্মেলনের এজেন্ডাগুলি তার আগেই চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছিল।

সম্মতি: আজকাল সম্মেলনগুলিতে সেশন রেকর্ড করা এবং অনলাইনে তা প্রচার করার প্রবণতা বাড়ছে, কিন্তু অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে প্রায়শই এই বিষয়ে সম্মতি বা অনুমতি চাওয়া হয় না। অনেকেরই নিজেদের পরিচয় এভাবে প্রকাশ্যে নিয়ে আসার মতো সামাজিক বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকে না, বিশেষ করে এমন কিছু ব্যক্তি বা প্রতিনিধি যারা অত্যন্ত সংবেদনশীল, অরক্ষিত কিংবা সামাজিকভাবে বিতর্কিত বা প্রান্তিক কোনো গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। উপরন্তু, যখন রেকর্ডিংগুলি শেয়ার করা হয়, তখন সাবটাইটেল এবং অডিও ডেসক্রিপশনের মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলিকে প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য না ভেবে ঐচ্ছিক বৈশিষ্ট্য হিসাবে গণ্য করা হয়।

খাবার: খাবারের টেবিলও এই উঁচু-নিচুর ভেদাভেদকে স্পষ্ট করে তোলে। বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমরা দেখেছি, বড় বড় ফান্ড দাতা বা অর্থায়নকারী সংস্থা এবং সম্মেলনের মূল পার্টনারদের জন্য আলাদা এবং ভিআইপি কক্ষে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে, আর বাকি সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের অন্য জায়গায় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি অনুষ্ঠানে আদিবাসী অংশগ্রহণকারীদের  একটি সম্পূর্ণ আলাদা লাইনে দাঁড়াতে বলা হয়েছিল। আবার অন্য আরেকটি সম্মেলনে, উপস্থিত অতিথিদের আদিবাসী সংস্কৃতি প্রদর্শনের নামে পাতায় করে নানারকম ‘আদিবাসী খাবার’ পরিবেশন করা হয়েছিল—কিন্তু যাদের খাবার এবং সংস্কৃতি প্রদর্শন করা হচ্ছিল, তাদেরকেই আলাদা করে রাখা হয়েছিল এবং তাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছিল।

3. কারা অ্যাক্সেসিবিলিটি বা সুযোগ-সুবিধা পায়

আমাদের সমাজে অ্যাক্সেসিবিলিটি বা প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিকে বড্ড সংকীর্ণভাবে দেখা হয়। সাধারণত এটিকে কেবল র‍্যাম্প, লিফট কিংবা সভাকক্ষের কাছাকাছি যাতায়াতের মতো কিছু ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং এই সামান্য সুযোগ-সুবিধাগুলিকেও তখনই অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যখন অনুষ্ঠানটি বিশেষভাবে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আয়োজিত হয়। অন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, এটিকে দায়সারা ভাবে করা হয় বা শেষ মুহূর্তের জন্য ফেলে রাখা হয়। অথচ একজন মানুষ আসলেই কোনো অনুষ্ঠানে স্বাচ্ছন্দ্যে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নির্ধারণ করে প্রতিদিনের অত্যন্ত সাধারণ কিছু প্রয়োজনীয়তা—যেমন ব্যবহারোপযোগী ও প্রতিবন্ধী-বান্ধব শৌচাগার, বসার সঠিক ব্যবস্থা, সহজ যাতায়াতের পথ এবং দিকনির্দেশক। এই জরুরি বিষয়গুলিকেই প্রতিনিয়ত উপেক্ষা করা হয়।

যখন পর্যাপ্ত বিরতি, শান্ত পরিবেশ এবং নমনীয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না, তখন সম্মেলনগুলি অজান্তেই এই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করে তোলে যে নিজের অধিকার বা সুযোগ বুঝে নেওয়ার দায় সম্পূর্ণ ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিজের।


আমাদের দলের অংশ নেওয়া একটি সম্মেলনে, ট্রান্সজেন্ডার অংশগ্রহণকারীদের আগে থেকে জানানোই হয়নি যে সেখানে কী ধরনের সুবিধা বা ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে শুধুমাত্র সিসজেন্ডারদের জন্য শৌচাগার ছিল এবং একজন অংশগ্রহণকারী শুধুমাত্র সেই শৌচাগারে প্রবেশ করার জন্য হেনস্থা হয়েছিলেন।

সময় এবং সংবেদী নকশা দ্বারাও অ্যাক্সেসিবিলিটি প্রভাবিত হয়। টানা আট থেকে দশ ঘণ্টার একটি সম্মেলন, যেখানে একের পর এক সেশন চলছে, তা দ্রুত ক্লান্তিকর হয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে নিউরোডাইভারজেন্ট ব্যক্তি বা এমন মানুষদের জন্য, যাদের প্রতিবন্ধকতা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। যখন পর্যাপ্ত বিরতি, শান্ত পরিবেশ এবং নমনীয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না, তখন সম্মেলনগুলি অজান্তেই এই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করে তোলে যে নিজের অধিকার বা সুযোগ বুঝে নেওয়ার দায় সম্পূর্ণ ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিজের, সমাজ বা আয়োজকদের নয়। 

সম্মেলনগুলি এমন হওয়ার প্রয়োজন নেই

সম্মেলনগুলি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আকর্ষক শেখার ও মত বিনিময়ের স্থান হওয়ার কথা—এবং তা হওয়া সম্ভবও। যদিও অনেক উদাহরণ রয়েছে, বিশেষ করে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের বড় বার্ষিক ফ্ল্যাগশিপ ইভেন্টগুলিতে যেখানে খামতিগুলি স্পষ্ট, তেমনই আবার এমন কিছু উদাহরণও রয়েছে যেখানে আয়োজকেরা অত্যন্ত সচেতন ও দূরদর্শী পরিকল্পনার পরিচয় দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলি দেখায় যে বঞ্চনা বা বিচ্ছিন্নতা অনিবার্য নয়; ইচ্ছা থাকলে সেই ব্যবধান দূর করা সম্ভব।

হায়দ্রাবাদের একটি অনুষ্ঠানে, পারস্পরিক পরিচিতি (নেটওয়ার্কিং) এবং খাওয়াদাওয়ার পর্বটিকে একে অপরের সাথে ভীষণ সুন্দরভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি একটি বড় হলঘরে আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে শুধুই মেঝেতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। একসঙ্গে বসে খাওয়া ও গল্প করার সেই পরিবেশ মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের কাছে নিয়ে আসে। একই জায়গায় পাশাপাশি বসার কারণে অচেনা ভাব, সংকোচ এবং অনিরাপত্তার দেয়াল অনেকটাই ভেঙে গিয়েছিল।

একইভাবে, অন্য একটি অনুষ্ঠানে, কোনো প্যানেলই ছিল না। সেখানে মানুষ নিজেদের কাজ তুলে ধরেছিলেন শিল্পের মাধ্যমে—যেমন নাটক, ছবি আঁকা কিংবা তাদের কাজের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বাস্তব উপস্থাপনার মাধ্যমে। অংশগ্রহণকারীরা কাজটির কথা শুধু শুনলেনই না, দেখলেন, অনুভব করলেন এবং তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করলেন। অন্য একটি সম্মেলনে, এমন আলাদা জায়গার ব্যবস্থা ছিল, যেখানে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়া সংগঠনগুলি একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে এবং একসঙ্গে শেখার সুযোগ পেয়েছিল।

এমনকি প্রচলিত প্যানেল আলোচনার মধ্যেও কিছু আয়োজক অংশগ্রহণকারীদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। একটি সম্মেলনে সভাকক্ষের পরিবেশ ও বসার জায়গাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে কোনো অংশগ্রহণকারী যদি অতিরিক্ত চাপ বা অস্বস্তি অনুভব করেন, তবে তিনি যেন কাউকে বিরক্ত না করে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিতে পারেন। এই চমৎকার উদ্যোগটি আসলে একটি গভীর সত্যকে স্বীকার করে নেয় যে কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্য সক্রিয় বা চোখে পড়ার মতো উপস্থিতির প্রয়োজন হয় না।

সম্মেলনগুলি যদি ফান্ডিং-এর বাধ্যবাধকতা না হয়ে, শিক্ষা, মতবিনিময় এবং একসঙ্গে ভবিষ্যৎ কল্পনা করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়, তবে অন্তর্ভুক্তিকরণকে একটি মূল নীতি হিসেবে গণ্য করতে হবে, কোনো গৌণ বিষয় হিসেবে নয়। সচেতন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা মানে শুধু প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা নয়। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে, অন্যের কথা শুনতে পারে, মতভেদ প্রকাশ করতে পারে, প্রয়োজনে বিশ্রাম নিতে পারে এবং নিজেদের সেই জায়গার অংশ বলে অনুভব করতে পারে। মানুষের অর্জিত অভিজ্ঞতা কোনো প্রদর্শন করার মতো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; এটি আসলে জ্ঞানেরই একটি অনন্য রূপ বা ভিত্তি যা মানুষের বাস্তবতার নিরিখে যেকোনো নীতি নির্ধারণ, তার রূপায়ণ এবং মূল্যায়নের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার যোগ্য।

IDR দলের সদস্যরা এই নিবন্ধে অবদান রেখেছেন।

এই নিবন্ধটির অনুবাদ এবং রিভিউ করেছে Shabd AI.

আরও জানুন

  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সম্মেলনগুলি কীভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে সেই সম্পর্কে আরও জানুন।
  • কীভাবে সামাজিক বর্জন একজন ব্যক্তির সেন্স অফ এজেন্সির (নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নিজের অবস্থান সম্পর্কে) ধারণাকে প্রভাবিত করে তা জানুন।
donate banner
We want IDR to be as much yours as it is ours. Tell us what you want to read.
ABOUT THE AUTHORS
কুমার উন্নয়ন-Image
কুমার উন্নয়ন

কুমার উন্নয়ন IDR হিন্দির একজন সহযোগী সম্পাদক। গত 12 বছর ধরে, তিনি মৌখিক ইতিহাসের গবেষক, ফিল্ড জার্নালিস্ট, লেখক এবং অনুবাদক হিসেবে বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন। IDR-এ যোগদানের আগে, উন্নয়ন সেন্টার ফর কমিউনিটি নলেজ, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ, নেহরু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরি, কথা, এবং দ্য কারভান-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি মৌখিক ইতিহাসেও বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

Srishti Gupta-Image
Srishti Gupta

সৃষ্টি গুপ্তা-Image
সৃষ্টি গুপ্তা

সৃষ্টি গুপ্তা আইডিআর-এর একজন সম্পাদকীয় সহযোগী, যেখানে তিনি ইংরেজি ও হিন্দিতে বিষয়বস্তু লেখা, সম্পাদনা এবং নির্বাচন করার দায়িত্বে আছেন। তিনি পূর্বে স্প্রিংগার নেচারে সম্পাদকীয় পদে কাজ করেছেন।তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং নিচুতলার দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী।

COMMENTS
READ NEXT